ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবারও আলোচনা শুরুর পথ তৈরি করতে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তেহরান সফরে যাচ্ছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানি। সফরে তিনি উত্তেজনা কমানো এবং দুই দেশের মধ্যে সংলাপ শুরুর পরিবেশ তৈরির বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
বুধবার (২৬ আগস্ট) কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী তেহরানে কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে উত্তেজনা কমানোর উপায় এবং আলোচনার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কাতার দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। গত জুনে কাতারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছিল, যার ফলে সাময়িকভাবে সংঘাত বন্ধ হয়েছিল। তবে জুলাইয়ে সেই সমঝোতা ভেঙে যায়। এরই মধ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। লড়াই অনেকটা থেমে থাকলেও স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানের কোনো অগ্রগতি এখনো দেখা যায়নি।
এদিকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটি।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করার জন্য তিনি কোনো তাড়াহুড়ো করছেন না। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ কার্যকর হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেছেন। জাতিসংঘে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি এসব নিষেধাজ্ঞাকে ‘রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করে সদস্য দেশগুলোকে তা কার্যকর না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, নিষেধাজ্ঞার কারণে খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দুই দেশের বিরোধের আরেকটি বড় বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ইরান প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ চায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এটিকে সবার জন্য উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে রাখতে চায়।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেহরানে বৈঠকে হরমুজ প্রণালির বিষয়টিও আলোচনা করবেন শেখ মোহাম্মদ। বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সফরের দুই দিন আগে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই আলোচনার পর ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন অস্থায়ী পথ নিয়ে একমত হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে ইরান বলেছে, জুনের সমঝোতা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দ করা সম্পদ ছাড়সহ নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত প্রণালিটি পুরোপুরি খুলবে না।
এর আগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও সংঘাতের অচলাবস্থা কাটাতে তেহরান সফর করেন। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ওই আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তেহরানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশমের মতে, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ সংঘাতের দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছে আঞ্চলিক দেশগুলো। যুদ্ধ শুরু হলে এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে—এ আশঙ্কা থেকেই দেশগুলো দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা
আরটিভি/জেএমএ