আসিফ আরসালান

জকসু বা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনেও ছাত্রশিবিরের ল্যান্ড স্লাইড বা ভূমিধ্বস বিজয় হয়েছে। এ বিজয় নিয়ে গত ৮ জানুয়ারি কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে কথা হচ্ছিলো। তাদের মধ্যে অন্তত ২ জন ছিলেন ডাকসুর প্রাক্তন ভিপি এবং ১ জন ডাকসুর প্রাক্তন জিএস। এরা যে উত্তর দিলেন বা তাদের উত্তরের যে ব্যাখ্যা দিলেন সেটা শুনে আমার একটা অনেক পুরাতন গল্পের কথা মনে পড়লো।

এক গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারের এক সন্তান স্কুলে পড়ে। সে খুব মেধাবী। প্রতিটি বার্ষিক পরীক্ষাতেই সে প্রথম স্থান অধিকার করে। গ্রামের যারা তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল তারা খুব ঈর্ষাপরায়ন হয়ে ওঠেন। একেক বছরের একেকটা রেজাল্ট বের হয় আর ঐ ঈর্ষাকাতর ব্যক্তিরা বলেন, ক্লাসে ভালো ফল করলে কী হবে, ম্যাট্রিকে ও ভালো করবে না। ম্যাট্রিক পরীক্ষা হলো। দেখা গেলো, ছেলেটি বোর্ডে স্ট্যান্ড করেছে। এই রেজাল্ট নিয়ে গ্রামে তুমুল হইচই। তখন ঈর্ষাকাতররা বললো যে, ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করলে কী হবে, কলেজের পড়াশোনা অত্যন্ত কঠিন। সেখানে সে খারাপ করবে। দেখা গেলো, ইন্টারমিডিয়েট বা আইএ পরীক্ষাতেও সে বোর্ডে স্ট্যান্ড করলো। হিংসুকরা বললো যে, গ্র্যাজুয়েশনে সে ডাব্বা মারবে। ছেলেটি অনার্স ক্লাসে ৪ বছর পড়লো। অনার্স পরীক্ষায় সে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হয়েছে। হিংসুকরা বললো, মাস্টার্স হলো শেষ পরীক্ষা এবং সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এখানে সে ডাব্বা মারবেই। কিন্তু মাস্টার্সেও সে প্রথম শ্রেণি পেলো। তখন নিন্দুকরা বললো যে, সে প্রথম শ্রেণি পেলে কী হবে? সে কোনো চাকুরি পাবে না। যখন সে চাকুরিও পেয়ে গেলো তখন নিন্দুকরা বললো যে, চাকুরি পেলে কী হবে, ও যে বেতন পাবে সে বেতনের টাকা বাজারে চলবে না।

তো এই হলো নিন্দুকদের স্বভাব। ওরা অন্যের বিশেষ করে সেই অন্যেরা যদি অর্থবিত্ত অথবা সামাজিক মর্যাদার দিক দিয়ে নিচু স্তরে থাকে তাহলে তাদের কোনো রকম উন্নতি ওরা সহ্য করতে পারে না এবং উল্টা পাল্টা ব্যাখ্যা দেয়।

আমি গত বৃহস্পতিবার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে জকসুর যে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আলোচনা করছিলাম সেখানে জকসুর ফলাফল প্রসঙ্গে আমরা আগের আলোচনায় ফিরে গেলাম। ডাকসুতে যখন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করলো তখন শিবির বা জামায়াতের সমর্থক বা বিরোধী নির্বিশেষে সকলের চোখ কপালে উঠেছিলো। এমনকি শিবির নিজেও কল্পনা করতে পারেনি যে, এমন বিশাল বিজয় তারা অর্জন করবে। কারণ শেখ হাসিনার ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো হলে কোনো ছাত্র সাহস করে বলতে পারতো না যে, সে শিবির বা জামায়াতের সমর্থক। ঘটনাচক্রে যদি কারো পরিচয় প্রকাশ পেতো যে সে মনে মনে শিবিরের সমর্থক তাহলে তার কপালে নেমে আসতো মধ্যযুগীয় বর্বর অত্যাচার।

আবরার ফাহাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা আপনারা সকলেই জানেন। সে শিবির করতো এমন কোনো ‘রটনাও’ বুয়েটে ছিলো না। কিন্তু বাংলাদেশের নদ-নদীসমূহের ন্যায্য পানি বন্টনে ভারত যে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে তার সমালোচনা করে তিনি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। আর এ স্ট্যাটাসই তার জীবনের কাল হলো। সকলেই জানেন, বুয়েটের একটি হলে ছাত্রলীগের মাস্তানরা তাকে দফায় দফায় এমন মার মেরেছিলো যে তিনি অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অবশ্য এব্যাপারে যে মামলা হয়, সে মামলায় আসামী ছাত্রলীগারদের প্রায় সকলেরই মৃত্যুদণ্ড হয়। তবে কোনো মৃত্যুদণ্ড এখনো কার্যকর হয়েছে বলে শোনা যায়নি। হতে পারে যে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীরা হয়তো উচ্চ আদালতে আপিল করেছে এবং সে আপিল সেখানে হয়তো পেন্ডিং রয়েছে। শুধু বুয়েট নয়, সারা বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ছাত্রলীগের ঘাতকরা ইসলামী ছাত্রশিবিরের জন্য নরক বানিয়ে রেখেছিলো। এব্যাপারে দৈনিক সংগ্রামের পাঠক পাঠিকারা যদি আরো বিস্তারিত জানতে চান তাহলে পড়ুন, বর্তমান আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সে সাড়া জাগানো উপন্যাস। নাম, ‘আমি আবু বকর বলছি’।

ফিরে আসছি আমাদের মূল আলোচনায়। যখন ডাকসুতে শিবির এমন অকল্পনীয় রেজাল্ট করলো তখন সেক্যুলার এবং প্রো-ইন্ডিয়ান ঘরানা বললো যে এটা জনমতের প্রতিচ্ছবি নয়। ‘জুলাই আন্দোলন’ (ওদের মতে জুলাই বিপ্লব তো পরের কথা ওটা জুলাই অভ্যুত্থানও ছিলো না) ঢাকায় প্রবল বেগে হয়েছিলো। তাই তার ইম্প্যাক্ট ঢাকায় থেকে গেছে। সেজন্য ডাকসুতে ওরা এতো ভালো ফল করেছে। তুমি দেখো, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরা কী করে? দেখা গেলো, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই। তখন আওয়ামী বা সিপিবি সুশীলদের গলার আওয়াজ একটু নিচু হয়।

এরপর চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও একই রকম ফলাফল হলে বলে যে, এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তো শিবিরের ঘাটি ছিলোই। তবুও দেখো, রাজশাহীতে ওরা জিএসের পোস্ট নিতে পারেনি। আমি যখন বললাম, রাজশাহীর জিএস শিবিরের না হলেও জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নেতৃস্থানীয় সমন্বয়ক। এছাড়া শিবির না করলেও আওয়ামী স্বৈরাচার এবং ভারত বিরোধিতায় রাজশাহীর জিএস শিবিরের চেয়েও এক ডিগ্রি বেশি কড়া। তখন ওরা বললো, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরা নির্ঘাত ফেল মারবে। কারণ পুরান ঢাকায় শেখ মুজিবের এখনো বিপুল সমর্থন আছে।

অবশেষে জকসুর ইলেকশনের রেজাল্ট পাওয়া গেলো। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এখানে শিবিরের বিরুদ্ধে অফিসিয়ালি যুক্তফ্রন্ট করেছিলো বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদল ও নুরুল হক নূরের গণঅধিকার পরিষদ। বিএনপি ও নূরের প্যানেলের নাম ছিলো ‘নির্ভিক জবিয়ান ঐক্য পরিষদ’। আর শিবিরের প্যানেলের নাম ছিলো, ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য পরিষদ’। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সমর্থকরা, যারা নিষেধাজ্ঞার ফলে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখছেন, তারাও বিএনপির নির্ভিক পরিষদে ভোট দিয়েছেন। সুতরাং নিট রেজাল্ট ছাত্রলীগ, ছাত্রদল এবং গণঅধিকার পরিষদ সমর্থিত প্যানেল এককভাবে ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্যানেলের কাছে গো হারা হেরেছেন। কোথায় গেলো পুরান ঢাকা? কোথায় গেলো পুরান ঢাকার শেখ মুজিবের সমর্থন? আসল কথা হলো ওরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছেন। সত্যটা তাহলে কী? সে বিষয়টিই এখন আমি পরিষ্কার করছি।

আসল কথা হলো, জেন-জি’রা নতুন চিন্তাধারায় বেড়ে উঠছেন। গ্রাম ও মফস্বলের যেসব শিক্ষার্থী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা প্রভৃতি মহানগরীতে এসে লেখাপড়া করছেন তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠি থেকে দ্রুত মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে রূপান্তরিত হচ্ছেন। এ জেন-জি’র সাথে মিলিত হয়েছেন তারা যাদের বয়স এখন ৩২ বা ৩৫ থেকে ৩৮। এ দু’প্রজন্মের মানস আগের রাজনীতি অর্থাৎ ১৯৮০ থেকে ২০২৪ এর জুলাই পূর্ব রাজনীতি থেকে সম্পূর্ন আলাদা। এরা কম বয়সেই প্রযুক্তির সাথে সংযুক্ত হচ্ছেন। তাদের আগের প্রজন্মের রাজনীতির সাথে অন্যান্য উন্নত এবং গনতান্ত্রিক দেশের রাজনীতি পর্যালোচনা করছেন। দেখছেন পুরানা রাজনীতিতে অনেক ভ্রান্তি। নতুন রাজনীতি যে কী সে সম্পর্কে তাদের সঠিক কোনো ধারণা না থাকলেও তারা নতুন কিছু চাচ্ছেন।

জুলাই বিপ্লব তাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছে। মার্কিন নির্বাচনে কৃষ্ণকায় বারাক ওবামার উত্থান আমেরিকার ২২৫ বছরের শ্বেতকায় প্রধান রাজনীতি থেকে আলাদা। কৃষ্ণকায় হয়েও একজন মার্কিনী হিসাবে তিনি এক নতুন শ্লোগান উদ্ভাবন করেন। সেটি হলো, Yes, we can do it. এ শ্লোগান শ্বেতকায়, কৃষ্ণকায় নির্বিশেষে সব ধরনের আমেরিকানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছিলো। তাই সাদা চামড়ার মার্কিনীরাও কালো চামড়ার বারাক ওবামাকে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছিলেন। কালজয়ী কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং আওয়াজ তুলেছিলেন, have a dream. মার্টিন লুথার কিংয়ের সাথে সাথে আমেরিকায় বসবাসকারী সমস্ত কৃষ্ণকায় এবং সে সাথে অনেক শ্বেতাঙ্গও মার্টিন লুথার কিংয়ের ঐ স্বপ্নে নিজেদেরকেও আচ্ছন্ন করেছিলেন।

জেন- জি’রা কৈশোর থেকে তরুণ গ্রুপের। জেন আলফারা এদের অব্যবহিত বয়সে বড় গ্রুপ। আলোচনাটা আর একটু খোলাসা করি। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের রাজত্বে ঘুষ দুর্নীতি ছাড়াও সবচেয়ে ভয়াবহ যে অপরাধটি তারা করেছিলো সেটি হলো, বল পূর্বক উঠিয়ে নেয়া (Enforced disappearance), অতঃপর ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যা। গত সপ্তাহে প্রকাশিত গুম কমিশনের রিপোর্টে দেখা গেছে যে, যাদেরকে গুম ও খুন করা হয়েছে তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই জামায়াত বা শিবিরের। গুম কমিশন বলেছে যে, বিগত ১৫ বছরের হাসিনার জুলুমশাহীতে অন্তত ৬ হাজার মানুষকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। এদের অধিকাংশকেই হত্যা করা হয়েছে।

বিএনপি অনেক বড় দল। আওয়ামী লীগের শ্বেত-সন্ত্রাসের আমলেও ২৪ ঘন্টার নোটিশে তারা ঢাকায় ৭/৮ হাজার মানুষকে জমায়েত করতে পারতো। জমায়েত তারা ঠিকই করেছে, কিন্তু হাসিনার জুলুমকে রুখে দাঁড়াতে পারেনি। সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ শুনলেই তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতো।

এর পাশাপাশি তারা সারা দেশে দেখেছে জামায়াত ও শিবিরের ওপর পাশবিক জুলুম। কিন্তু তারা মাথানত করেনি। জুলাই বিপ্লবে তারা কোনো ক্রেডিট নিতে চায়নি। নিজেদের নাম গোপন করে হাসিনার জুলুমশাহীকে খতম করার জন্য তারা গুলীর সামনে বুক পেতে দিয়েছে। এছাড়া কোনো শিবির বা জামায়াত কর্মীকে তারা ১৫ বছরে কোনো রকমের অপকর্মে জড়িত হতে দেখেনি।

জেন-জি এবং জেন-আলফারা যে ধরনের পরিশুদ্ধ মানুষ এবং সমাজকে বুকে লালন করতেন তারই ছায়া দেখেছেন তারা শিবির এবং জামায়াতের মধ্যে। সাদিক কায়েম তো কোনো দিন নিজের ঢোল নিজে পেটাননি। সাদিক কায়েমের মতো অন্যেরাও তাই। কিন্তু সাধারণ ছাত্ররা এবং দেশের যুবক সমাজ ছাইয়ের মধ্যে অমূল্য রতন দেখেছেন। তাই সে অমূল্য রতনকে তারা ভোট দিয়েছেন।

লেখাটি শেষ করছি সে অমর কবিতা দিয়ে:

যেখানে দেখিবে ছাই

উড়াইয়া দেখো তাই

পাইলেও পাইতে পারো

অমূল্য রতন।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews