বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষ করে ভারতনীতি একমাত্র আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী ঘরানা ছাড়া আর সকল মহলে দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এটি এখন একটি জ¦লন্ত সত্য যে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এখন একেবারে তলানীতে ঠেকেছে। বলা বাহুল্য, একজন বাংলাদেশি হিসাবে বলছি না, একজন নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষক হিসাবে বলছি যে, সম্পর্কের এই অবনিতর জন্য সম্পূর্ণভাবে ভারত দায়ী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে জুলাই বিপ্লব সম্পন্ন হয়, তারপর যে সরকার আসে, অর্থাৎ ড. ইউনূসের সরকার, সে সরকার তো প্রথমে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেনি। কিন্তু ভারত গায়ে পড়ে এই সম্পর্ক নষ্ট করে। সে বলে যে, সে নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক করবে।
ভারতের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে বাংলাদেশের বিপ্লবের বিরুদ্ধে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া বাঁধানোর অপচেষ্টা দেখা যায়। জুলাই বিপ্লব তো ছিলো বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বিপ্লব। সর্বশ্রেণীর মানুষ এই বিপ্লবে যোগ দিয়েছিলেন। ঢাকা মহানগরী থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ পর্যন্ত ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। এত বড় একটি দুনিয়া কাঁপানো বিপ্লবকে ভারত স্বীকার করলো না কেনো? শেখ হাসিনাকে তারা আশ্রয় দিলো। ড. ইউনূস সেটাও স্বীকার করে নেন। শুধু বলেন যে, হাসিনা সেখানে থাকতে পারে। তবে সে যেনো বাংলাদেশ বা রাজনীতি নিয়ে কোনো কথা না বলে। ড. ইউনূসের এই কথা ভারত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। তার ১৮ মাসের শাসনামলে শেখ হাসিনা প্রতিটি মুহূর্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আওয়ামী সমর্থকদের সাথে কথা বলে গেছেন এবং তাদেরকে সরকারবিরোধী সমাবেশ করার জন্য উসকানি দিয়েছেন। এছাড়া তিনি যখন তখন অডিও ক্লিপে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে গেছেন।
ভারত নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক করতে চেয়েছিলো। তারেক রহমানের বিএনপি সরকার একটি যথার্থ নির্বাচিত সরকার। তার আমলে শেখ হাসিনা দিল্লীতে বিদেশি সংবাদদাতাদের ক্লাবে একটি প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করেন। বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার পূর্বাহ্নেই ভারতকে অনুরোধ করে যে, শেখ হাসিনা যেনো ঐ সংবাদ সম্মেলন করা থেকে বিরত থাকেন। ভারত এবার নির্বাচিত সরকারের এই অনুরোধকেও উপেক্ষা করে। ভারতের এই উপেক্ষা হজম করা একটি নির্বাচিত সরকারের জন্য কঠিন ছিলো। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। দুইটি দেশের সরকার প্রধানের বৈঠকের জন্য দেশ দুটিতে অনুকূল পরিবেশ থাকা প্রয়োজন। শেখ হাসিনার উক্ত প্রেস কনফারেন্স এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধকে ভারতের উপেক্ষা সেই অনুকূল পরিবেশকে বিষিয়ে তোলে। ফলে যা ঘটবার তাই ঘটলো। তারেক রহমানের ভারত সফর ঝুলে গেলো। বাংলাদেশ সরকার দাবি জানায় যে, শেখ হাসিনা ও তার দলবলকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ ত্বরান্বিত করা হোক। বাংলাদেশ আরো দাবি করে যে, শহীদ ওসমান হাদির খুনীদের ভারত আশ্রয় দিয়েছে। তাদেরকে অবিলম্বে ফেরত দেওয়া হোক।
আসলে বাংলাদেশের এই দুটি দাবি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। কিন্তু ভারত এখানে নতুন এক প্যাঁচ কষলো। শেখ হাসিনা ও শহীদ ওসমান হাদি উভয়ের প্রত্যর্পণকে তারা আইনগত ব্যাপার বলে নতুন ব্যাখ্যা দিলো। বলা হলো যে, বাংলাদেশের আদালত শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদ- দিয়েছে। ভারত পরীক্ষা করে দেখবে যে, এই মৃত্যুদ- আইনগতভাবে সঠিক হয়েছে কিনা। এজন্য শেখ হাসিনার মৃত্যুদ-ের রায় সম্পর্কিত সমস্ত কাগজপত্র ভারতে পাঠাতে হবে। আর ওসমান হাদির খুনীদের সম্পর্কে বললো যে, ওরা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছে। সে কারণে কলকাতায় ওদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে ভারত সরকার মামলা করেছে। এই মামলার ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত ওসমান হাদির খুনের অভিযোগে অভিযুক্তদের বাংলাদেশের হাতে প্রত্যর্পণ করা যায় না।
সুতরাং, এখন বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, অদূর ভবিষ্যতে শেখ হাসিনা ও তার দলবল এবং ওসমান হাদির খুনীদের ভারত ফেরত পাঠাচ্ছে না। আর ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে না।
বাংলাদেশ সরকারের এই কঠোর অবস্থানকে শুধুমাত্র আওয়ামী ঘরানা ছাড়া ১৮ কোটি মানুষের সর্বশ্রেণীর মানুষ সমর্থন দিয়েছেন।
॥দুই॥
সেজন্যই শুরু করেছি এই বলে যে, এই সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষ করে ভারতনীতিকে সমাজে সর্বশ্রেণীর মানুষ অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র বিদেশনীতি নিয়েই তো একটি দেশ চলে না। ভেতরেও যোগ্য ও সুশাসন দরকার। একজন নিরপেক্ষ দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসাবে দেশের সঠিক চিত্র সরকারের নিকট তুলে ধরা প্রয়োজন। আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি যে, অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কয়েকটি ঘটনায় সরকারের বিরুদ্ধে মৃদু সমালোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান ঘটনা হলো গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাব। গ্রামে গঞ্জে তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। ড. ইউনূসের আমলে ঢাকা মহানগরীতে কোনো লোডশেডিং হয়নি। কিন্তু এখন গত এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর অভিজাত এলাকাসহ সর্বত্র প্রতিদিন লোডশেডিং হচ্ছে। অনেক মানুষকে আমি বলতে শুনেছি, ইউনূসের আমলে লোডশেডিং হয়নি। এখন কেনো হচ্ছে? বিষয়টি টেকনিক্যাল। কিন্তু সাধারণ মানুষ এসব টেকনিক্যাল সমস্যার গভীরে অতীতেও কোনো দিন যাননি, আজও যেতে চাইবেন না। তারা চান নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। এখন সেই বিদ্যুতের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস বা কয়লা বা ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল কোত্থেকে আসবে সেটি সরকারের বিষয়। জনগণ অতশতো বুঝতে চান না।
এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন যে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট দূর করতে কম করে হলেও ২ বছর সময় দরকার। তাহলে মানুষের এই ভোগান্তি কি আগামী ২ বছরের আগে শেষ হবে না? সকলের বোঝা দরকার যে, বিষয়টি খুব স্পর্শকাতর।
যেদিন আমি এই কলামটি লিখছি সেদিন অর্থাৎ গত রবিবারও আমাদের এই ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠাল বাগান এরিয়াতে সারাদিন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ার মতো গ্যাস এসেছে। গ্যাসের চুলা জ¦লেছে ধিকি ধিকি। প্রায় অধিকাংশ বাসাতেই গ্যাসের প্রেসার কিছুটা বেশি হয় রাতে। এই অবস্থা দুই চার দিন বা বড়জোর এক সপ্তাহ চলতে পারে। কিন্তু তার বেশি হলেই জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, গ্যাস এবং বিদ্যুতের ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে সেটি সরকারের অত্যন্ত খোলাসা করে বলা দরকার। গত ২১ জুলাই মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি অংশ পুড়ে যায়। টার্মিনালটির নাম এক্সিলারেটর। অপরটি হলো, সামিট এলএনজি। বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা হলো, ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সেখানে সরবরাহ হয় ২১০ থেকে ২৩০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি কম করে হলেও ১৫০ কোটি ঘনফুট।
এক্সিলারেটের কৌশলগত উপদেষ্টা হলেন বাংলাদেশে কাজ করা প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। আর সামিট এলএনজির মালিক হলেন মোহাম্মদ আজিজ খান। মোহাম্মদ আজিজ খান শেখ হাসিনার ক্যাবিনেটে মন্ত্রী ফারুক খানের আপন ভাই। আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯-২০২৪ সময়কালে সামিট গ্রুপ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অত্যন্ত বড় ব্যবসায়িক অবস্থান তৈরি করে। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে খবরের কাগজ দাবি করেছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের সময়ে সামিট গ্রুপ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
যাই হোক, এক্সিলারেটরের পোড়া অংশ আংশিক মেরামতের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। কিন্তু এর পরদিন সামিটের টার্মিনালে গ্যাসের সরবরাহে সঙ্কট দেখা দেয়। কারণ, জ¦ালানিবাহী ট্যাঙ্কার সময় মতো টার্মিনালে ভিড়তে পারেনি।
॥তিন॥
যদি মহেশখালীর দুই টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহে সঙ্কট বর্তমান বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণ হতো তাহলে হয়তো স্বল্প মেয়াদে এই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান করা যেতো। কিন্তু সমস্যা সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যা অন্যত্র। সেটি বিস্তারিত আলোচনা করলে অনেক টেকনিক্যাল বিষয় এসে পড়ে।
মোটা দাগে বলা যায় যে, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম। এটিই প্রধান এবং বড় কারণ। অথচ, আমাদের জেনারেশন ক্যাপাসিটি ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। গ্রীষ্মকালীন চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট। অথচ, সর্বোচ্চ উৎপাদন হলো, ১৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। ঘাটতি ২ হাজার মেগাওয়াট। এইমুহূর্তে ৩ হাজার মেগাওয়াট।
শীতকাল না আসা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে বৈ কমবে না। সুতরাং, ঘাটতি থেকেই যাবে। এর একমাত্র সমাধান হলো, আমাদের দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কালবিলম্ব না করে বৃদ্ধি করা। সেই সাথে সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল যতদ্রুত যত বেশি পরিমাণে করা সম্ভব সেটি করা।
গ্যাস-বিদ্যুৎ এগুলো নিয়ে অনেক কায়েমী স্বার্থ ও পুকুর চুরির কাহিনী রয়েছে। আওয়ামী আমলে ভারতের স্বার্থে একটি বিশেষ ঘরানার ব্যবসায়ীদেরকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বানানোর জন্য ইচ্ছা করে দেশে তেলকূপ খনন এবং বুø-ইকোনোমির অনুসন্ধান বছরের পর বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্কযুক্ত অলিগার্কদের পকেট ভারি করার জন্য আমদানিনির্ভর জ¦ালানিনীতি বছরের পর বছর অনুসরণ করা হয়েছে। কুইক রেন্টালের সর্বনাশা প্ল্যান্ট জাতির ঘাড়ে চাপানো হয়েছে। ক্যাপাসিটি ট্যাক্সের নামে বসে বসে কোনো উৎপাদন না করেও শত শত কোটি টাকা পেমেন্ট করা হয়েছে। ড. ইউনূস ওইসব শে^তহস্তিকে খামোস করে দিয়েছিলেন।
এখন এই সরকারকে যেটা করা প্রয়োজন, সেটি হলো জনগণের কাছে জ¦ালানির সামগ্রিক নির্ভেজাল চিত্র তুলে ধরা এবং কতদ্রুত দেশকে জ¦ালানিতে স্বয়ম্ভর করা যায় সেই পরিকল্পনা তুলে ধরা এবং সেটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
ঊসধরষ:লড়ঁৎহধষরংঃ১৫@মসধরষ.পড়স