কখনো থানা পুলিশের ক্যাশিয়ার, কখনো গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সোর্স, আবার কখনো নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের প্রতিনিধি-এমন নানা পরিচয়ে প্রায় দুই দশক ধরে কর্ণফুলীতে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে আব্দুস সবুর ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, জাহাজ ও ট্রলার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং এলাকাবাসীর দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এ চক্র উপজেলার বিভিন্ন ঘাট, বাজার ও নদী তীরবর্তী এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে মাসে লাখ লাখ টাকা আদায় করছে।
যদিও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, থানায় ‘ক্যাশিয়ার’ নামে কোনো পদই নেই এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় সূত্র জানায়, কর্ণফুলীর পুরাতন ব্রিজঘাট এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সবুর, যিনি এলাকায় ‘ডাব সবুর’ নামে পরিচিত। প্রায় ২০ বছর আগে একজন সাধারণ ডাব বিক্রেতা ছিলেন তিনি। পরে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে থানার ‘ক্যাশিয়ার’ হিসাবে পরিচয় দিতে শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর থেকেই নদীঘাট, বাজার ও বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ এলাকায় তার প্রভাব বাড়তে থাকে।
নদীঘাট থেকে অপরাধের স্পট-সবখানেই মাসোহারা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীসংলগ্ন বিভিন্ন ঘাটে জাহাজ থেকে চোরাই তেল, স্ক্র্যাপ, গম, চিনি, কয়লাসহ অন্যান্য পণ্য পাচারের সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে এ সবুরের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসা, জুয়ার আসর, অবৈধ তেল ব্যবসা এবং নদীভিত্তিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারীদের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
একাধিক ব্যবসায়ী জানান, মাসের নির্দিষ্ট সময়ে চাঁদা দিতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশি হয়রানি, মিথ্যা মামলা কিংবা ব্যবসা পরিচালনায় বাধা দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। এ কারণে অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কর্ণফুলীতে ব্যবসা করতে হলে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে কখন কী হয়রানি হবে, সে ভয় সবসময় কাজ করে।’
মাঠে এখন নাতি, নিয়ন্ত্রণে সবুর : স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বয়সের কারণে আব্দুস সবুর আগের মতো সরাসরি সব জায়গায় যান না। তার পরিবর্তে সাকিব নামে এক যুবক, যাকে স্থানীয়রা তার নাতি বলে জানেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে গিয়ে চাঁদা সংগ্রহ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ওই যুবক নিজেকে কখনো পুলিশের সোর্স আবার কখনো ক্যাশিয়ার পরিচয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদাবাজি করেন। স্থানীয়দের দাবি, কর্ণফুলীর চরপাথরঘাটা, পুরাতন ব্রিজঘাট, ইছানগর বাংলাবাজার ঘাট, বিএফডিসি গেট, নতুন ব্রিজের দক্ষিণ পাড়, শিকলবাহা, জুলধা, ফকিরনিরহাট, দারোগারহাট, ডাঙ্গারচরসহ অন্তত শতাধিক স্পটে নিয়মিত এ চাঁদাবাজি চলে।
সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একসময় আর্থিকভাবে অসচ্ছল থাকা আব্দুস সবুর বর্তমানে বিপুল সম্পদের মালিক। স্থানীয়ভাবে তিনি কয়েকটি দোকান, জমি এবং একটি বিলাসবহুল বাড়ির মালিক হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি বাড়িসহ নামে-বেনামে আরও সম্পদ রয়েছে তার। তবে এসব সম্পদের উৎস এবং মালিকানার বিষয়ে কোনো সরকারি নথি এ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে সম্পদের বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের লিখিত অভিযোগ : সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে পুলিশের নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অপরাধীদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়ের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ব্যক্তির কারণে পুলিশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কারণ সাধারণ মানুষ অনেক সময় প্রকৃত পুলিশ ও কথিত সোর্স বা ক্যাশিয়ারের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুস সবুর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকতে প্রতিমাসে ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকা পর্যন্ত উঠত। এখন পাঁচ লাখ টাকার বেশি ওঠে না। তার মধ্যে থানায় তিন লাখ টাকা দিতে হয়। সাংবাদিকসহ আরও অনেককে টাকা দিতে হয়। আমার হাতে তেমন কিছু থাকে না।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। এ নামে কোনো ক্যাশিয়ার আছেন কি-না, তা এ মুহূর্তে জানি না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানাব। আর যদি কেউ থানার নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করে, তাহলে তাকে আটকে রেখে সঙ্গে সঙ্গে থানায় খবর দিন। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অন্যদিকে পুলিশের দাবি, তারা এ ধরনের কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রশ্রয় দেন না এবং নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।