বর্তমান শহুরে জীবনযাত্রায় বাবা-মা দুজনই চাকরি করেন- এমন পরিবারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিস, যানজট, সভা আর কাজের চাপে সন্তানকে সবসময় সময় দেওয়া অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু শিশু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ব্যস্ততার মাঝেও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শুধু বাইরের সমাজ নয়, অনেক সময় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, পরিচিত মানুষ কিংবা ঘরের ভেতরের অসচেতনতাও শিশুর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই এখন শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়, বরং শিশুর শারীরিক নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি এবং ডিজিটাল সচেতনতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থা ইউনিসেফ-এর বিভিন্ন প্যারেন্টিং গাইডলাইন অনুযায়ী, শিশুর সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ছোট শিশুকে কখনো পুরোপুরি একা না রাখাই ভালো
অনেক পরিবারে কাজের প্রয়োজনে শিশুকে কিছু সময়ের জন্য বাসায় একা রাখা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কন্যাশিশু হলে আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। হঠাৎ দুর্ঘটনা, অসুস্থতা কিংবা অপরিচিত কারও উপস্থিতিতে শিশু বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। আবার অনলাইন স্ক্যাম বা ভয় দেখানোর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
১২ বছরের কম বয়সী শিশুকে দীর্ঘ সময় একা না রাখাই নিরাপদ। যদি কেয়ারগিভার বা গৃহকর্মী রাখা হয়, তাহলে অবশ্যই তার ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন করা উচিত। শুধু পরিচিত কারও কথার উপর নির্ভর না করে জাতীয় পরিচয়পত্র, স্থায়ী ঠিকানা এবং আগের কর্মস্থলের তথ্য যাচাই করা জরুরি।
শিশুকে শুধু ভয় নয়, স্মার্ট সচেতনতা শেখান
অনেক অভিভাবক নিরাপত্তা শেখাতে গিয়ে সন্তানকে অতিরিক্ত ভয় দেখান। এতে শিশুর মধ্যে দুশ্চিন্তা তৈরি হতে পারে। বরং শান্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ উপায়ে কিছু মৌলিক নিরাপত্তা নিয়ম শেখানো প্রয়োজন। যেমন- কোনো অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে কিছু না নেওয়া, মা-বাবার অনুমতি ছাড়া কোথাও না যাওয়া এবং কেউ অস্বস্তিকর আচরণ করলে জোরে “না” বলতে শেখানো।
এছাড়া নিরাপদ স্পর্শ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে বয়স উপযোগী শিক্ষা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতনতা শিশুর নিরাপত্তার বড় অংশ।
দরজার নিরাপত্তা ও ঘরের নিরাপত্তা
বর্তমানে ডেলিভারি ম্যান, সার্ভিস প্রোভাইডার কিংবা বিভিন্ন পরিচয়ে অনেক মানুষ বাসার দরজায় আসে। তাই শিশুকে শেখাতে হবে, একা থাকলে দরজা না খুলতে। ভিডিও কল বা ফোনে আগে বাবা-মাকে জানানো এবং মা-বাবা বাসায় নেই এমন তথ্য কাউকে না বলাও জরুরি।
অনেক পরিবার এখন একটি “নিরাপদ শব্দ” ব্যবহার করে। অর্থাৎ জরুরি পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কেউ সেই শব্দ জানবে না। এতে শিশু সহজে বুঝতে পারে কে সত্যিই নির্ভরযোগ্য।
ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের একটি
স্মার্টফোন, ট্যাব ও অনলাইন ক্লাসের কারণে শিশুরা এখন ইন্টারনেটে অনেক বেশি সময় কাটায়। কিন্তু সাইবার ঝুঁকিও একই সঙ্গে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় অনলাইন বন্ধুত্ব, গেমিং বা সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই বিপদের শুরু হয়।
অভিভাবকদের উচিত শিশুর ডিভাইসে প্রাইভেসী সেটিং চালু রাখা এবং অপরিচিত কাউকে ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য না পাঠাতে শেখানো। একই সঙ্গে রাতে একা মোবাইল ব্যবহার কমানো ও প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ইউনিসেফ প্যারেন্টিং গাইডে বলা হয়েছে, শিশুর সঙ্গে নিয়মিত অনলাইন কার্যক্রম নিয়ে কথা বলা নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
কর্মজীবী বাবা-মায়ের সাধারণ কিছু ভুল
অনেক বাবা-মা ভাবেন, আমার বাচ্চা অনেক পরিপক্ব, তাই তাকে বেশি স্বাধীনতা দেওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে শিশুর বিচারক্ষমতা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয় না। আবার ব্যস্ততার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানের ছোট ছোট ইঙ্গিতও বুঝতে পারেন না।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, অল্প বয়সে সীমাহীন স্মার্টফোন অ্যাক্সেস দেওয়া এবং পরিচিত মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, সব পরিচিত মানুষই সবসময় নিরাপদ নাও হতে পারে।
প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট ‘কোয়ালিটি টাইম’ দিন
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট শিশুর সঙ্গে মোবাইল-মুক্ত সময় কাটানো জরুরি। এই সময়টাতে স্কুলের গল্প, বন্ধুদের কথা কিংবা অনলাইন অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলা উচিত। শিশু যদি বুঝতে পারে মা-বাবা তাকে জাজ না করে মন দিয়ে শুনবেন, তাহলে সে ভয় বা সমস্যার কথাও সহজে শেয়ার করবে।
নিরাপত্তা শুরু হোক পরিবার থেকেই
কন্যাশিশুর নিরাপত্তা শুধু সিসিটিভি ক্যামেরা, স্মার্ট লক বা প্রযুক্তির বিষয় নয়, এটি বিশ্বাস, সচেতনতা এবং পারিবারিক যোগাযোগের বিষয়ও।
ব্যস্ত শহুরে জীবনে সময় কম থাকতেই পারে, কিন্তু সচেতন প্যারেন্টিং ও কিছু ব্যবহারিক নিরাপত্তা পদক্ষেপ একটি শিশুর জীবনকে অনেক বেশি নিরাপদ করতে পারে। কারণ, একটি নিরাপদ শৈশবই গড়ে তোলে আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যৎ।