ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ১২ দিন বাকি। তবে নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, তা বাধাগ্রস্ত করতে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। একদিকে দিল্লিতে বসে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা নির্বাচনবিরোধী নানা বক্তব্য দিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির ইন্ধন দিচ্ছেন, আরেকদিকে দেশের অভ্যন্তরের ষড়যন্ত্রকারিরা নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ সহকারী ড. আলী রিয়াজের একটি বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গণে বিতর্কের সূচনা করেছে। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ফেসবুকে একটি ফটোকার্ডে আলী রিয়াজের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যরা ১৮০ দিন গণপরিষদ হিসেবে কাজ করবেন।’ এ নিয়ে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে এ মন্তব্যকে নতুন করে ম্যাটিকুলাস ডিজাইন করা এবং নির্বাচনে কোনো দল জয়লাভ করার পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলে মন্তব্য করেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’ জিতবে, সেটা না জেনেই আলী রিয়াজ কীভাবে পরবর্তী ১৮০ দিনের হিসাব নিয়ে কথা বলেন? এর মধ্যে দুরভিসন্ধি রয়েছে। আলী রিয়াজের এমন বক্তব্যের ব্যাপক সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে, গত বৃহ¯পতিবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ফ্যাক্টসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, গণভোটের ফল ‘হ্যাঁ’ হলে অন্তর্বর্তী সরকার ৬ মাস পর ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, অধ্যাপক আলী রীয়াজ কোথাও বলেননি যে, অন্তর্বর্তী সরকার ১৮০ দিন গণপরিষদ হিসেবে কাজ করবে; বরং তিনি বলেছেন, এই দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। বিবৃতির এক অংশে বলা হয়েছে, তিনি বলেছেন, সংবিধানকে ফ্যাসিবাদের পথ থেকে সরাতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। সে জন্য নির্বাচিত সদস্যরা আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া স¤পন্ন করবেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা যখন তুঙ্গে, তখন অধ্যাপক আলী রীয়াজের বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হওয়া স্বাভাবিক। সরকার যতই ব্যাখ্যা দিক না কেন, আলী রিয়াজের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে জনমনে এক ধরনের শঙ্কা, সন্দেহ ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত বক্তব্য, সেটা যেভাবেই দেয়া হোক, তা কাম্য হতে পারে না। উল্লেখ করা নিস্প্রয়োজন, নির্বাচনকালীন সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শুধু রুটিন কাজ করা। এমন কোনো নীতিনির্ধারণী কাজ করা বা বক্তব্য দেয়া উচিৎ নয়, যা সমালোচনার জন্ম দেয়। আমরা দেখেছি, অন্তর্বর্তী সরকার অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনী সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। নির্বাচনী ঢামাঢোলের মধ্যে গোপনে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক স্থাপনা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। এর প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক-কর্মচারি সংগঠনগুলো ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ সময়ের এ চুক্তির মাধ্যমে আগামী সরকারকে বিপাকে ফেলার আয়োজন করছে। অন্যদিকে, সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণার জন্য সর্বস্তরের সরকারি-কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়ে আরেক বিতর্কের সূচনা করেছে। এ নিয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার এ ধরনের নির্দেশনা দিতে পারে কিনা। এই বিতর্কের মধ্যে, নির্বাচন কমিশন গত বৃহস্পতিবার সব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে দেয়া এক চিঠিতে বলেছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোটের বিষয়ে জনগণকে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন। তবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য কোনোভাবে জনগণকে আহ্বান জানাতে পারবেন না। এ ধরনের প্রচারণা গণভোট অধ্যাদেশ অনুযায়ী দ-নীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। দেখা যাচ্ছে, সরকারের একের পর এক সিদ্ধান্ত নানা ধরনের বিতর্ক তৈরি করছে। শুধু তাই নয়, উপদেষ্টাদের কেউ কেউ এমন বক্তব্য দিচ্ছেন, যা সরকারের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আলী রিয়াজের বক্তব্য ও ভূমিকা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। পর্যবেক্ষকদের মতে, মার্কিন এই নাগরিক অনেকটা ‘উড়ে এসে জুড়ে বসে’ তার বক্তব্য ও কর্মকা-ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে সমালোচিত হয়েছেন। তিনি তার পারপাস সার্ভ ও বিদেশিদের ‘ডিল মেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাদের মতে, তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নিজের এবং বিদেশিদের স্বার্থ হাসিলে কাজ করছেন, যা দেশের জন্য ক্ষতিকর। তিনি এমনসব বেফাঁস মন্তব্য করেছেন, যা আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরকে প্রলম্বিত করার এক ধরনের ইঙ্গিত দেয়। এজন্য সরকারকে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, তার মধ্যে ক্ষমতায় থাকার আগ্রহ রয়েছে এবং যতদিন পারা যায়, ক্ষমতায় থাকতে চান। এ কথা বহুল প্রচলিত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টার মধ্যে নানা ছুঁতোয় ‘যে কয়দিন পারা যায়, ক্ষমতায় থাকতে চাই’, এ ধরনের প্রবণতা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচ বছর, দশ বছর বা তারো বেশি সময় থাকুক, এমন বয়ানও তৈরি করা হয়েছিল। নির্বাচন যখন অতি সন্নিকটে এবং সব আয়োজন সম্পন্ন, তখন আলী রিয়াজের বক্তব্য বা অতিকথন নিয়ে বিতর্ক এবং নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের হাতে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করা নিয়ে জনমনে সন্দেহ ও বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নির্বাচন করে নির্বাচিত সরকারের হাতে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কীভাবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দেয়া যায়, তার সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং সেদিকে মনোযোগ দেয়া। এর বাইরে রুটিন কাজ ছাড়া, তার অন্যকোনো কাজ নেই। এর মধ্যে যদি সরকারের কোনো উপদেষ্টা এমন কাজ করেন, যার জন্য তাকে পরবর্তীতে বিচারের মুখোমুখি হতে হয় এবং তা সমর্থনযোগ্য হবে, তবে তা দুঃখজনক। মনে রাখা দরকার, ওয়ান-ইলেভেন সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টা বিতর্কিত কাজে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে বলে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তাদের কেউ কেউ এখনো দেশে ফিরতে পারেননি। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টা তাদের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হোক, তা দেশের মানুষ আশা করে না। তাদের এখন মূল ফোকাস হওয়া উচিৎ, নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। এমন কোনো ‘ফাউল টক’ বা বেফাঁস ও অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য-মন্তব্য করা সমীচীন হবে না, যার জন্য নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ও সন্দেহ তৈরি হয়।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews