মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে বরিশালে আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক দুই এমপি। শুধু এই দুজন নয়, গত এক সপ্তাহে মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতিসহ অন্তত ৩ প্রভাবশালী নেতা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে। পাশাপাশি জামিন পেয়েছেন আওয়ামী লীগসহ দলটির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের আরও অন্তত ডজনখানেক নেতা। বিষয়টি নিয়ে বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। আওয়ামী সমর্থক আইনজীবীদের দাবি-নিয়ম মেনেই জামিন দিচ্ছেন বিচারক। যদিও তা মানতে নারাজ ৫ আগস্টের পর আদালত অঙ্গনে নিয়োগ পাওয়া আইন কর্মকর্তারা। জামিন অযোগ্য ধারার কথা উল্লেখ করে বিরোধিতা সত্ত্বেও আসামিদের জামিন দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। বিচারকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যেহেতু কিছু বলার এখতিয়ার নেই তাই কোনো প্রতিবাদও করতে পারছেন না তারা। জেলা বিএনপির নেতারা বলছেন, এভাবে ঢালাও জামিনে ভুল বার্তা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে। জরুরি ভিত্তিতে এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত আইন মন্ত্রণালয়ের।
সোমবার বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এসএম শরিয়তউল্লাহর আদালতে হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক এমপি তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস। বরিশালে বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলা মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর অভিযোগে হয়েছিল ওই মামলা। ইউনুস ছাড়াও মামলাটিতে আসামি রয়েছেন সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. একেএম জাহাঙ্গীরসহ দলের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা। আওয়ামী লীগ সরকার পতন এবং মামলার কারণে ৫ আগস্টের পর থেকে পলাতক ছিলেন তিনি। হঠাৎ হাজির হয়ে তার এই জামিন আবেদনে তোলপাড় হয়ে ওঠে আদালত প্রাঙ্গণে। মহানগর ও জেলার দুই পাবলিক প্রসিকিউটরসহ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি-সম্পাদক ছুটে যান আদালতে। মামলায় জামিন অযোগ্য ধারা এবং আবেদনের প্রথম তারিখ হওয়ায় তাকে জামিন না দেওয়ার অনুরোধ করেন তারা। কিন্তু দুই পক্ষের শুনানি শেষে ইউনুসকে জামিন দেন বিচারক। এরপর আদালত ত্যাগ করেন তিনি।
তালুকদার ইউনুসের আইনজীবী আওয়ামী লীগ নেতা কাইয়ুম খান কায়সার বলেন, ‘২০১৮ সালের তথাকথিত এক ঘটনায় ২০২৪ সালে মামলাটি করা হয়। আমরা সবাই জানি যে মামলাটি মিথ্যা। তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস নিজেও একজন আইনজীবী। আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন তিনি। মামলার পূর্বাপর সবকিছু বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞ বিচারক তাকে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত জামিন দিয়েছেন। এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।’ কায়সারের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. সাদিকুর রহমান লিংকন বলেন, ‘তার (ইউনুস) বিরুদ্ধে থাকা মামলায় জামিন অযোগ্য ধারা ছিল। সেই কারণ দেখিয়ে তাকে যাতে জামিন দেওয়া না হয় সেজন্য বিচারকের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম। কিন্তু আদালত আমাদের আপত্তি আমলে নেননি। এখানে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে মোট ৩টি। একটি মামলায় তিনি জামিন পেলেন। বাকি দুটি মামলার ব্যাপারে আদালতকে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ কিংবা তাকে গ্রেফতারের আবেদন করেনি পুলিশ। যে কারণে সহজেই আদালত থেকে চলে যেতে পারলেন তিনি।’
ইউনুসের জামিনের মাত্র ৬ দিন আগে আদালত থেকে জামিন পান বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সাবেক এমপি আওয়ামী লীগ নেত্রী জেবুন্নেসা আফরোজ। ১৮ ফেব্রুয়ারি একইদিনে তিনিসহ জামিন পান আরও ২ জন। তারা হলেন-যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হক খান মামুন ও বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসিমউদ্দিন। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ৩ থেকে ৭টি পর্যন্ত মামলা ছিল বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন থানায়। সবগুলো মামলায় একের পর এক জামিন পাওয়া এই নেতারা ওইদিনই কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে যান। বরিশাল জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাড. হাফিজ আহম্মেদ বাবলু বলেন, ‘কেবল এরা নয়, কয়েকদিন ধরে সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছেন ৫ আগস্টের পর হওয়া মামলার আসামিরা। যাদের বেশির ভাগ আওয়ামী-যুবলীগ-ছাত্রলীগসহ ফ্যাসিস্ট দলের নেতাকর্মী। এত সহজে তাদের জামিন পাওয়া নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যারা আইন কর্মকর্তা আছি তাদের আপত্তিও কানে তুলছেন না বিচারক। বিষয়টি সত্যিই হতাশার। হঠাৎ কেন জামিনের তোড়জোড় তাও আমাদের মাথায় আসছে না।’
এ বিষয়ে বরিশালের মেট্রোপলিটন পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাড. নাজিমউদ্দিন আহম্মেদ পান্না বলেন, ‘বিজ্ঞ অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব এমন অনেক লোককে জামিন দিয়েছেন যাদের জামিন বিজ্ঞ মহানগর দায়রা জজ নামঞ্জুর করেছিলেন। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসাবে সাবেক এমপি জেবুন্নেসা আফরোজ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাতিজা মঈন আব্দুল্লাহর কথা বলতে পারি। উচ্চ আদালতে নামঞ্জুর হওয়া সত্ত্বেও তাদের জামিন দিয়েছেন অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। উচ্চ আদালতে নামঞ্জুর করা আদেশকে যদি বিজ্ঞ নিম্ন আদালত অগ্রাহ্য করে তাহলে আদালতের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে।’
বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাড. আবুল কালাম শাহিন বলেন, ‘বিএনপি সবেমাত্র সরকার গঠন করেছে। এখনো সবক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমার মনে হয় এই সুযোগটির অপ-ব্যবহার করে একটি শ্রেণি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জামিন দিচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলায় জামিন অযোগ্য ধারা থাকা সত্ত্বেও কাজটি করছে তারা। এতে সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপি সম্পর্কে যাচ্ছে ভুল বার্তা। আমি মনে করি জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া উচিত আইন মন্ত্রণালয়ের।’