সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের মদ নিষিদ্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নেটিজেন এবং বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টির গভীরতা ও আইনি কাঠামো না বুঝেই কেবল 'সস্তা জনপ্রিয়তা' অর্জনের লক্ষ্যে তিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন। বিশেষ করে মদ ও মাদকের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য এবং দেশের প্রচলিত আইন সম্পর্কের বিষয়টি তুলে না ধরে একতরফাভাবে উপস্থাপন করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল করছেন অনেকে।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের এই দাবির বিপরীতে সমালোচকরা বলছেন, বাংলাদেশে মদের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াটি নতুন কিছু নয়। এমনকি খোদ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী যখন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রী ছিলেন, তখন তার আমলেই মদের লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স প্রদানের নজির রয়েছে। নির্ভরযোগ্য তথ্য মতে, তৎকালীন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম বাবুল মদের অন্যতম বড় লাইসেন্স পেয়েছিলেন ওই আমলেই। ফলে বর্তমানে জামায়াত নেতার এই দাবিকে অনেকেই 'দ্বিমুখী নীতি' হিসেবে দেখছেন।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জাতীয় সংসদের বিগত অধিবেশনে তার বক্তব্যে মদের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘‘আল্লাহ তাআলা মদকে হারাম করেছেন। এই মদ মানুষের বিবেক-বুদ্ধি লোপ করে দেয় এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। অথচ আমাদের দেশে সরকারিভাবে মদের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমি সরকারকে অনুরোধ করব, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং দেশের যুবসমাজকে রক্ষা করতে অতিদ্রুত এই মদের লাইসেন্স বাতিল করা হোক এবং দেশে মদ পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক।’’
ঐতিহাসিকভাবেও দেখা যায়, অটোমান সাম্রাজ্য (উসমানি খেলাফত) থেকে শুরু করে মুঘল আমল পর্যন্ত মুসলিম শাসিত রাষ্ট্রগুলোতে অমুসলিম বিদেশি নাগরিক এবং পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় মদ ব্যবহারের সুযোগ ছিল। বর্তমানে সৌদি আরবসহ অনেক রক্ষণশীল মুসলিম দেশও পর্যটন ও বিদেশি অতিথিদের কথা মাথায় রেখে সীমিত পরিসরে এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মদের লাইসেন্স প্রদান করছে। বাংলাদেশের আইনেও ঢালাওভাবে মদ উন্মুক্ত নয়; বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তি, ক্লাব এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য এটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
সমালোচকরা বলছেন, অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের বক্তব্যে সবচেয়ে বড় যে ত্রুটি ধরা পড়েছে, তা হলো মদ ও মাদকের মধ্যে গুলিয়ে ফেলা। বিশ্লেষকদের মতে, মদ একটি নির্দিষ্ট পানীয় যা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে লাইসেন্সের মাধ্যমে বৈধতা পায়। অন্যদিকে, মাদক (যেমন: ইয়াবা, আইস, হেরোইন) সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এর বিস্তার বর্তমানে যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ইয়াবা বা ফেনসিডিলের মতো বিধ্বংসী মাদক নিয়ে জামায়াত এমপির সংসদে জোরালো কোনো ভূমিকা বা দাবি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে মাদকের কারণে প্রতিবছর পাচার হয়ে যায় ৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। আর মাদক কেনাবেচা করে অর্থ পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। এশিয়ার দেশগুলো বিবেচনায় নিলে মাদকের মাধ্যমে টাকা পাচারের ঘটনায় বাংলাদেশ একেবারে শীর্ষে রয়েছে।
নেটিজেনরা বলছেন, মাদক পরিস্থিতি বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এবং হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। এই বৃহত্তর জাতীয় সংকটের কথা বাদ দিয়ে কেবলমাত্র ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে মদের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানানোকে রাজনৈতিক চাল হিসেবে দেখছেন সচেতন সমাজ।
সামাজিক মাধ্যমে আরেকটি বিষয় বেশ জোরেশোরে আলোচনায় এসেছে। টেকনাফের সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদির (যিনি ইয়াবা ইস্যুতে বিতর্কিত) সাথে জামায়াত এমপির ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্পর্কের গুঞ্জন রয়েছে। নেটিজেনদের প্রশ্ন, যেখানে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে যোগসাজশের অভিযোগ আছে, সেখানে মদ নিষিদ্ধের দাবি জানানো কতটা নৈতিক? মাদক নিয়ে জামায়াতের এই 'রহস্যজনক নীরবতা' তাদের আন্তরিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সমালোচকরা বলছেন, কোনো কিছুকে 'হারাম' ঘোষণা করার এখতিয়ার একমাত্র ইসলামি শরিয়াহর। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও এর রাষ্ট্র পরিচালনা হয় প্রচলিত সাংবিধানিক আইনে। বর্তমান বিএনপি সরকারও 'ইসলামি সরকার' নয়। ফলে সংসদীয় ব্যবস্থায় আইনি কাঠামোয় যা নিয়ন্ত্রিত, তাকে হুট করে হারাম বলার দাবিটি আইনিভাবে হাস্যকর। উল্লেখ্য যে, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রায়শই বারগুলোতে রেইড দিয়ে অবৈধ মদ বা নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
আশিকুর রহমান নামে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘‘জামায়াত এমপি সাহেবের উচিত ছিল আগে মাদক আর মদের পার্থক্য বোঝা। দেশে যে হাজার হাজার যুবক ইয়াবায় আসক্ত হয়ে মরছে, সেটা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। তিনি এসেছেন সস্তা সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলতে। নিজের দলের লোক যখন মন্ত্রী ছিল, তখন কেন বন্ধ করেননি?’’
ফারিয়া আহমেদ লিখেছেন, ‘‘মদ এবং মাদক এক নয়। মদ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি বিষয়। কিন্তু ইয়াবা বা আইস তো ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। জামায়াত নেতাদের এই সিলেক্টিভ প্রতিবাদ আসলে রাজনৈতিক ভন্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। আর শুনলাম উনার সাথে বদির আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। যদি তাই হয়, তবে বুঝাই যাচ্ছে কেন তিনি আসল মাদক নিয়ে চুপ। মদ তো লাইসেন্সধারী ব্যক্তিরা খায়, কিন্তু মাদক তো পুরো দেশ ধ্বংস করছে। সংসদে এসব হাস্যকর দাবি তুলে সময় নষ্ট করা ঠিক না।’’
সুলাইমান কবির লিখেছেন, "ইসলামে মদ হারাম, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা আর ফতোয়া দেওয়া এক কথা নয়। তুরস্ক বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলোও যদি কৌশলগত কারণে মদের লাইসেন্স দেয়, তবে আমাদের এখানে এত হৈচৈ কেন? আমরা বিদেশি বিনিয়োগ চাই কিন্তু বিদেশি পর্যটক বা অতিথিদের জন্য সুযোগ-সুবিধা রাখতে চাই না তাহলে কি তারা আসবেন! আর জামায়াত যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন লাইসেন্স দেওয়া কি জায়েজ ছিল?’’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদে অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের দেওয়া বক্তব্যটি যৌক্তিক ভিত্তির চেয়ে আবেগের ওপর বেশি দাঁড়িয়ে ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। ইতিহাস, আইন এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মদের লাইসেন্স একটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে কার্যকর কোনো কথা না বলে কেবলমাত্র মদের পেছনে লাগা এবং জামায়াতের পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডের বৈপরীত্য তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই বড় করে দেখাচ্ছে। দেশের সচেতন মানুষ এখন আর কেবল ধর্মীয় বুলিতে বিভ্রান্ত হতে রাজি নয়, তারা চায় মাদকমুক্ত সুস্থ সমাজ।