আসন্ন গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানী ঢাকায় ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ২১২৯টি। এসব কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ (পুলিশের তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ) কেন্দ্রের সংখ্যা ১৬১৪টি। বাকিগুলোকে সাধারণ কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, ভোটকেন্দ্রগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের জন্য মোট ১২টি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করছে ডিএমপি। এগুলোর মধ্যে মূল কন্ট্রোল রুম চারটি এবং সাব কন্ট্রোল রুম আটটি। আর ভোটকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তায় ডিএমপির ফোর্স থাকবে ২৭ হাজার। এর বাইরে নিয়োজিত থাকবেন বিপুলসংখ্যক সেনা, বিজিবি, র্যাব, আনসার, কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য ইউনিটের সদস্যরা। সূত্র আরও জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচন কমিশন চারজন করে পুলিশ সদস্য চাইলেও কোনো কোনো কেন্দ্রে ফোর্স দ্বিগুণ করে আটজন করছে ডিএমপি। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার চাহিদার প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি গাড়ি রিকুইজিশন করেছে পুলিশের সবচেয়ে বড় এই ইউনিটটি। রিকুইজিশন করা গাড়িগুলো পুলিশ ছাড়াও আনসার, বিজিবি এবং ম্যাজিস্ট্রেটসহ দায়িত্ব পালনকারী অন্যরা এসব ব্যবহার করবেন। নির্বাচনি প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সরকারের প্রত্যাশা, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন উৎসবমুখর, আনন্দঘন পরিবেশে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে। এ লক্ষ্যেই পুলিশের সঙ্গে কাজ করছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আনসার ও কোস্ট গার্ডসহ অন্যান্য বাহিনী। পুলিশের বিশেষ অভিযান চলমান। নিরাপত্তাব্যবস্থাকে খুব সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রতি সপ্তাহেই মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে পদস্থ কর্মকর্তাদের বৈঠক হচ্ছে। সব পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। ঘটনার ভিডিওচিত্র ধারণ করতে প্রত্যেক কেন্দ্রেই থাকবে একটি করে বডি ওর্ন ক্যামেরা। পুলিশের যে কর্মকর্তা কেন্দ্র ইনচার্জ হিসাবে থাকবেন তার শরীরেই থাকবে ওই ক্যামেরা। কেন্দ্রের সব দৃশ্যই ধারণ করা থাকবে ওই ক্যামেরায়। বিষয়টি শুধু ডিএমপির কন্ট্রোল রুম থেকেই নয়, মনিটরিং করা হবে পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও।
নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে সুনির্দিষ্ট কোনো থ্রেট নেই উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, সাইবার অপরাধীরা নির্বাচন ঘিরে সক্রিয় থাকবে-এই আশঙ্কা আমরা অনেক আগে থেকেই করছিলাম। কারণ, সাইবার ওয়ার্ল্ড একটি বিরাট ওয়ার্ল্ড। এই জগতে ফেসবুক হ্যাক করে, অনেক ক্ষেত্রে এআই জেনারেটেড প্রোফাইল ক্রিয়েট করে বিভিন্ন ধরনের প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। বিষয়টি আমরা অনেক আগে থেকেই মনিটরিং করছি। এ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বিটিআরসি, সাইবার পুলিশ সেন্টার, সিটিটিসি এবং ডিএমপির সাইবার ইউনিট কাজ করছে। ইতোমধ্যেই অনেক পেজ চিহ্নিত করা হয়েছে। নেতিবাচক কনটেন্ট রিমুভ করা হচ্ছে।
ডিএমপি সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী মেট্রোপলিটন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) কেন্দ্রগুলোতে একজন করে পুলিশ অফিসার এবং তিনজন করে ফোর্স থাকবেন। আর সাধারণ কেন্দ্রে একজন অফিসারের পাশাপাশি ফোর্স থাকবেন দুজন করে। এর বাইরে পুলিশের মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ও রিজার্ভ ফোর্স থাকবে। নিরাপত্তাব্যবস্থা সহজতর করতে একেকটি ভেন্যুকে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ভাগ করেছে ডিএমপি। মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ১১টি কেন্দ্র করা হয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো হয়েছে কেন্দ্র অনুযায়ী। কেন্দ্রগুলোতেও নির্বাচন কমিশনের চাহিদার চেয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ একক কেন্দ্র নির্বাচন কমিশনের চাহিদা চারজনের হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেখানে আটজন (একজন অফিসার ও সাতজন কনস্টেবল) করে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। ফোর্স ছাড়াও কয়েকটি কেন্দ্রের জন্য থাকবে মোবাইল পার্টি। মোবাইল পার্টিকে সহযোগিতার জন্য থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স। আর স্ট্রাইকিং ফোর্স নিয়োজিত থাকবে দুই স্তরে। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একটি স্তরে থাকবে শতাধিক স্ট্রাইকিং ফোর্স। আর দ্বিতীয় স্তরে নির্বাচনের দিন এই ফোর্স দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
সূত্র জানায়, নির্বাচন চলার সময়ে ডিএমপি পক্ষ থেকে চারটি মূল কন্ট্রোল রুম থাকবে। এই কন্ট্রোল রুমগুলো থাকবে আব্দুল গণি রোড, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স, মিরপুর পুলিশ লাইন্স ও গুলশান পুলিশ লাইন্সে। এসব কন্ট্রোল রুমের মূল দায়িত্বে থাকবেন একজন করে অতিরিক্ত কমিশনার। এছাড়া প্রত্যেক ক্রাইম ডিভিশনে একটি করে মোট আটটি সাব কন্ট্রেল রুম থাকবে। সাব কন্ট্রোল রুমগুলো স্থাপন করা হবে শাহবাগ, পল্টন, বংশাল, যাত্রাবাড়ী, তেজগাঁও, মিরপুর মডেল, গুলশান এবং উত্তরা পশ্চিম থানায়। এসব কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ থাকবেন একজন করে যুগ্ম কমিশনার। প্রত্যেক সাব কন্ট্রোল রুমে রিজার্ভ প্যাট্রল ও রিজার্ভ ফোর্সের বাইরে এক্সটা রিজার্ভ ফোর্স থাকবে। এসব ফোর্স যেকোনো প্রয়োজনে যেকোনো স্থান মুভ করবে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব এবং আনসার সদস্যরাও টহল ও প্যাট্রল ডিউটিতে থাকবেন।
রাজধানী ঢাকার ১৫টি নির্বাচনি এলাকার জন্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এরই মধ্যে ১৫টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পুলিশের সমন্বয় করে এসব ক্যাম্প এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) এসএন নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা অনেক আগে থেকেই নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করেছি। এ প্রস্তুতির অংশ হিসাবে গত ১৪ ডিসেম্বর থেকে ডেভিল হান্ট ফেস-২ অপারেশন শুরু করেছি। এই অপারেশনে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৬টি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশি পিস্তল, ছয়টি বিদেশি রিভলবার, একটি একনালা বন্দুক, ৩৯০ রাউন্ড গুলি, ১৫৭ রাউন্ড কার্তুজ, ২৬টি ম্যাগাজিন, ১৬ দশমিক ৩০০ কেজি বিস্ফোরক দ্রব্য, ৩৮টি পটকা, ছয়টি চাইনিজ কুড়াল, ১৮টি চাপাতি, দুটি দা, ৩৩টি ছোড়া, একটি সামোরাই, একটি চাকু, ছয়টি সুইচ গিয়ার চাকু, একটি করাত, দুটি লোহার তুরি, একটি ব্লেড এবং দুটি কাঁচি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া পরিত্যক্ত অবস্থায় চারটি বিদেশি রিভলবার, ১১টি বুলেট, ৭৭ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, দুটি গুলির খোসা, দুটি ম্যাগজিন, একটি রিভলবারের কভার, একটি চাপাতি, দুটি ছুরি এবং একটি চাকু উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা ৫২ জন অবৈধ অস্ত্রধারীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছি। এক হাজার ২৩৮ জন চোরাকারবারি ও মাদক ব্যবসায়ী, ৩৭২ জন ছিনতাইকারী, ৭২৪ জন চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে ১০ হাজার ৮৪টি টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর সেনাবাহিনী-পুলিশ ও র্যাবের সমন্বয়ে যৌথ টহল হয়েছে এক হাজার ৩৮৪টি।
ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, নির্বাচন পূর্ববর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা কাজ করছি। ঢাকা মহানগরীতে প্যাট্রল কার্যক্রম অনেকাংশে বাড়ানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। নির্বাচন ঘিরে সামনের দিনগুলোতে নাশকতার কোনো আশঙ্কা নেই। এআইয়ের অপপ্রচার ও গুজব প্রতিরোধে জনগণকে সচেতন করতে হবে।