মাদক একটি মরণনেশা ও মারাত্মক বৈশ্বিক সমস্যা। ইহা জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলিতেছে। উন্নত-অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল কোনো দেশই ইহার ক্ষতিকর প্রভাব হইতে মুক্ত নহে। ইহা অবৈধ পাচার, নানা অপরাধ বৃদ্ধি ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নষ্ট করিবার ক্ষেত্রে পালন করিতেছে ন্যক্কারজনক ভূমিকা; কিন্তু মাদকের ভয়াবহতা মোকাবিলায় যেই রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সামাজিক সচেতনতা এবং জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দরকার তাহা বিশ্বে দেখা যাইতেছে না বলিলেই চলে!

বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের মতে, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও খুনসহ রাজধানীতে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধের সহিত রহিয়াছে মাদকাসক্তির সম্পর্ক। আশঙ্কার বিষয় হইল, বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হইয়াও মাদকাসক্তির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। যেই সকল দেশে মাদক উৎপাদিত হয় সেই সকল দেশের চক্রের মধ্যে বাংলাদেশ অবস্থিত, যেমন-দক্ষিণ-পূর্বে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসে উৎপন্ন হয় পপিগাছ (আফিম)। আবার উত্তর-পশ্চিমে গোল্ডেন ক্রিসেন্ট পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরান। ফলে এতদঞ্চলের মাদক ব্যবসার প্রভাব বাংলাদেশকেও প্রভাবিত করে যেই ব্যাপারে আমাদের যতটা সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার ছিল, তাহাতে আমরা কর্তব্যনিষ্ঠার পরিচয় দিতে পারি নাই। তাহার প্রমাণ হইল সাম্প্রতিক এক জাতীয় গবেষণার ফলাফল। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে পরিচালিত সেই গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৮২ লক্ষ। সর্বাপেক্ষা শঙ্কার বিষয় এই যে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর এক বৃহৎ অংশই তরুণ এবং তাহাদের অধিকাংশই আঠারো বৎসর বয়স পূর্ণ হইবার পূর্বেই এই সর্বনাশা পথে পা বাড়াইয়াছে। এই তথ্য কেবল একটি সংখ্যা নহে, ইহা জাতির মেরুদণ্ড বলিয়া পরিচিত যুবসমাজের অবক্ষয়ের এক মর্মান্তিক চিত্র। ইহাতে ইহাও প্রমাণিত হয় যে, মাদকাসক্তির ধরন যেমন বাড়িতেছে, তেমনি ইহা আজ শহর-গ্রাম-সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ইহা একটি সুন্দর ও শান্তিময় সমাজব্যবস্থার অন্তরায় এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

উক্ত গবেষণায় দেখা যায়, দেশে মাদকসেবীদের মধ্যে গাঁজা সবচাইতে বেশি সেবন করা হয়। ইহার পরেই রহিয়াছে ইয়াবা, হেরোইন এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে গৃহীত মাদকের স্থান। একসময় দেশে ফেনসিডিল ছিল বহুল প্রচলিত মাদক। এখন সেইখানে নিত্যনূতন মাদক জায়গা করিয়া লইতেছে। বিশেষ করিয়া ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের ক্রমবর্ধমান হার জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ বার্তা বহন করিতেছে। ঢাকা বিভাগে মাদকাসক্তের সংখ্যা সর্বাধিক হইলেও, মফস্সল ও গ্রামাঞ্চলেও এই ব্যাধি দ্রুতগতিতে ছড়াইয়া পড়িতেছে, যাহা আরো উদ্বেগজনক। বিশেষ করিয়া সীমান্তবর্তী জেলাসমূহে মাদকের সহজলভ্যতা এই সংকটকে আরো ঘনীভূত করিয়াছে। পরিবেশ ও সঙ্গদোষ, কৌতূহল এবং পারিবারিক অশান্তি কিশোর-তরুণদের এই অন্ধকারের দিকে ঠেলিয়া দিতেছে। কোমলমতি প্রাণগুলি যখন জীবনের লক্ষ্য স্থির করিবে, তখনই তাহারা মাদকের নীল দংশনে নীল হইয়া যাইতেছে-ইহা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।

অধিকাংশ মাদকাসক্ত ব্যক্তি গুরুতর মানসিক ও শারীরিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। তাহাদের এক বিশাল অংশ সুচিকিৎসা কিংবা পুনর্বাসন সেবা হইতে বঞ্চিত। যথাযথ চিকিৎসার অভাব ও সামাজিক পুনরন্তর্ভুক্তির সুযোগ না থাকায় মাদক ছাড়িবার পর পুনরায় তাহাতে লিপ্ত হইবার প্রবণতা পরিলক্ষিত হইতেছে। এমতাবস্থায় আমরা মনে করি, মাদক সমস্যাকে কেবল দণ্ডবিধির আয়নায় না দেখিয়া ইহাকে একটি জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বড় সংকট হিসাবে বিবেচনা করা অত্যাবশ্যক। সরকারকে মাদক চোরাচালান রোধে যেমন কঠোর হইতে হইবে, তেমনই কিশোর ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অধিক যত্নশীল হইতে হইবে। কেবল আইন দিয়া এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নহে; ইহার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন এবং ব্যাপক জনসচেতনতা। পরিবারের অভিভাবকগণকে তাহাদের সন্তানদের প্রতি অধিকতর দৃষ্টিদান করিতে হইবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করিতে হইবে। যদি আমরা এই মাদকের গতিরোধ করিতে না পারি, তাহা হইলে দেশের ভবিষ্যৎ এক গভীর অন্ধকারের অতলে নিমজ্জিত হইবে। অতএব, তরুণ সমাজকে রক্ষা করা আজ জাতীয় কর্তব্য বলিয়া বিবেচিত হওয়া উচিত।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews