দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। চাল, ডাল, তেল, শাকসবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দাম ও সিন্ডিকেট চক্রের দৌরাত্ম্যে সীমিত আয়ের মানুষ দিশেহারা। রমজানে লেবু, কাচামরিচ সহ ইফতারী ও সেহরীর পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে আয়ের তুলনায় ব্যয়ের অসহায় ভারসাম্যহীনতায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ।
খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বল্গাহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ, খেটে খাওয়া এবং সীমিত আয়ের নাগরিকদের জীবনে নাভিশ্বাস পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে ।
এদেশের সিংহভাগ মানুষ দিন আনে দিন খায়। এমতাবস্থায় নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির ফলে এসব মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সব দ্রব্যের মূল্য ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই তুলনায় মানুষের আয় দ্রব্যমূল্যের সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের সিংহভাগ মানুষ তাদের চাহিদা মেটাতে অক্ষম হয়ে পড়ছে। মানুষ এখন মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে পারছে না। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়েছে। অনেকে তিন বেলা খাবারও জোটাতে পারছেন না। একসময় শোনা যেত বাংলার সমৃদ্ধির কথা। গোলাভরা ধান ছিল, গোয়াল ভরা গরু ছিল। বিখ্যাত শাসক শায়েস্তা খানের আমলে এক টাকায় পাওয়া যেত আট মণ চাল। বাংলার মানুষের ছিল না খাদ্যের অভাব। তারা সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করত। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে। বেড়েছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির হার; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অধিক মূল্যবৃদ্ধি যেন এদেশের মানুষের কাছে প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাপন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য হলো ভাত। বর্তমানে প্রতি কেজি চালের দাম ৫০ থেকে ৮০ টাকা। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের চাল কেনাও হয়ে পড়েছে দুর্বিষহ। ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক প্রদানকৃত চালের অংশও পাচ্ছে না তারা। কিছু সুবিধাবাদী মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে গরিব অসহায় মানুষের জন্য সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত চালসহ অন্যান্য মালামাল তারা সম্পূর্ণ পরিমাণ নিতে পারছে না। নিত্যদিনে রান্না করার প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে তেল, পেঁয়াজ, সবজি, চাল, ডাল, চিনি, লাকড়ি ইত্যাদি ও নানা ধরনের শাকসবজি ব্যবহৃত হয়। উক্ত শাকসবজিগুলোর দামও লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে।
দেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্য হলো আটা। মানুষের খাদ্য তালিকায় ভাতের পর রুটি থাকে, যা আটা বা গম দিয়ে তৈরি। সম্প্রতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আটা ও গমের মূল্য লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক বছরে আটার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। আটার মূল্য ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির ফলে আটাজাতীয় খাদ্যের পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ টন কমে গেছে।
মাছে ভাতে বাঙালি হিসেবে বিশ্বে আমাদের খ্যাতি রয়েছে; কিন্তু বর্তমানে মাছের অত্যধিক মূল্যের কারণে দেশের অধিকাংশ সাধারণ জনগণের মাছ কেনার সামর্থ্য নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অত্যধিক মূল্যের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।
শিক্ষাপণ্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, এক বছরে দাম বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। এছাড়া নিউজপ্রিন্টের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় তিন গুণ। ফলে শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণসমূহের মূল্য দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক দিনে বইয়ের মূল্য প্রায় ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে একই অবস্থা। ওষুধপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম—সবকিছুরই মূল্য সাধারণ মানুষের আওতার বাইরে।
মানুষের আয় বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে রাখতে হবে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফা লাভের আশায় বেশি দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করে। এসব অসাধু ব্যবসায়ীকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তাদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়াতে হবে। টিসিবির পণ্যগুলো সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করার জন্য সরকারি কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নিশ্চিতকরণে দ্র?ব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি রোধ করা অতীব জরুরি। নতুবা এদেশের মানুষের পক্ষে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে জীবন যাপন করা আরো দুর্বিষহ হয়ে পড়বে।
যারা অবৈধ উপায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে, তাদের ব্যাপারে ইসলাম খুব কঠোর। ভয়ঙ্কর শাস্তি নির্ধারিত আছে তাদের জন্য। দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর অন্যতম উপায় মজুদদারি। অসাধু ব্যবসায়ীরা মূলত পণ্য মজুদ করার মাধ্যমেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। ফলে ক্রেতারা সংকটে পড়েন।
অথচ অধিক মুনাফার জন্য পণ্য মজুদ করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হাদিস অনুযায়ী শুধু পরকালে নয়, ইহকালেও আল্লাহর আজাব থেকে রেহাই দেওয়া হবে না তাদের। মহানবী (স.) বলেন, ‘কেউ যদি খাদ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, আল্লাহ তাকে দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দ্বারা শাস্তি দেন।’ (ইবনে মাজাহ: ২২৩৮)
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিনের খাবার মজুদ রাখে, সে আল্লাহ-প্রদত্ত নিরাপত্তা থেকে বেরিয়ে যায়।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা: ২০৩৯৬)
ভোক্তাদের জিম্মি করে বিত্তশালী হওয়ার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই; বরং ক্ষতি আর ক্ষতি। অবৈধ উপার্জন একদিকে জাহান্নামে যাওয়ার কারণ, অন্যদিকে দুনিয়ার জীবনও অভিশপ্ত। উপরন্তু উপার্জন হারাম হওয়ায় তার নামাজ, রোজা, হজসহ কোনো নেক আমলই কবুল হবে না। আল্লাহ তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে যান। তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন খাদ্য মজুদ রাখল সে আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, আল্লাহ দূরে গেলেন তার কাছ থেকে।’(মুসনাদে আহমদ: ৮/৪৮১)
সুতরাং বর্তমান সময়ে পণ্য মজুদ করে যারা দাম বৃদ্ধি করছেন, তারা মূলত ইসলাম থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন। পবিত্র কোরআনে তাদের সতর্ক করা হয়েছে এভাবে—‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের মোহচ্ছন করে রেখেছে। এমনকি তোমরা কবরে পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত।’ (সুরা তাকাসুর : ১-২)
অন্যদিকে, মজুদদারি না করে স্বাভাবিক ব্যবসা করলে তা পরিণত হবে ইবাদতে। হালাল ব্যবসা থেকে উপার্জনে বরকত রয়েছে এবং অপ্রত্যাশিত রিজিক দেওয়া হয় তাকে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘খাঁটি ব্যবসায়ী রিজিকপ্রাপ্ত হয়, আর পণ্য মজুদকারী অভিশপ্ত হয়।’ (ইবনে মাজাহ: ২/৭২৮)
হাশরের ময়দানেও হালাল ব্যবসায়ীকে পুরস্কৃত করা হবে; নবীগণের সঙ্গী হওয়ার পরম সৌভাগ্য লাভ করবেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীদের হাশর নবী, সিদ্দিক ও শহীদগণের সঙ্গে হবে।’ (তিরমিজি: ৩/৫১৫)
সুতরাং ব্যবসায়ীদের উচিত ব্যবসায় অবৈধ উপায় বন্ধ করা। অকারণে পণ্যের দাম বাড়ানো থেকে বিরত থাকা। অবৈধ মজুদ বন্ধ করা। অমানবিকতা বন্ধ করে ভ্রাতৃত্ববোধকে সুসংহত করা এবং বিগত গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করা।
নবী কারিম (স.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন ব্যবসায়ীরা মহা অপরাধী হিসেবে উত্থিত হবে। তবে যারা আল্লাহকে ভয় করবে, নেকভাবে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসা করবে তারা ব্যতীত’ (তিরমিজি: ১২১০)। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সকল ব্যবসায়ীদের মুনাফার জন্য পণ্য মজুদ করা থেকে হেফাজত করুন। নিজ নিজ ব্যবসাকে ইবাদতে পরিণত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
উপসংহার:
দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে কঠিন করে তুলেছে। জনজীবন সচল রাখতে এবং নিম্ন আয়ের মানুষকে স্বস্তি দিতে দ্রুত কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠু বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। ব্যাংকিং খাতগুলো অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এজন্য ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা দরকার। মানুষের জীবন-জীবিকা সংকোচনের পাশাপাশি জাতীয় জীবনে নানান ধরনের সংকট দেশবাসীকে হতাশায় নিমজ্জিত করছে।
লেখক: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এনভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন এবং চ্যানেল কর্ণফুলী ও সিটিজি টাইমস