বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতার নিঃসঙ্গতা একটি গভীর সামাজিক সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে আমাদের দেশেও। একসময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা ছিলেন সম্মান, অভিজ্ঞতা ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারার কারণে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আজ অনেক সন্তান উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত এবং অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলেও তাদের অনেকেই বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি প্রয়োজনীয় দায়িত্ব ও যত্ন পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এক রত্নগর্ভা মায়ের করুণ মৃত্যুর ঘটনা সমগ্র দেশকে নাড়া দিয়েছে। যে মা সারা জীবন সন্তানের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই মায়ের জীবনের শেষ সময়টি কেটেছে নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও কষ্টের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই এমন অসংখ্য ঘটনার খবর চোখে পড়ে। কোথাও বৃদ্ধ বাবা-মা একা ঘরে মৃত্যুবরণ করছেন, কোথাও সন্তানদের অবহেলায় অসুস্থ দিন কাটাচ্ছেন, আবার কোথাও সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর তাঁরা হয়ে যাচ্ছেন পরিবারের বোঝা। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে আমরা হয়তো ডিগ্রি অর্জন করেছি, কিন্তু মানবিকতা, কৃতজ্ঞতা ও নৈতিক শিক্ষার অনেকাংশই হারিয়ে ফেলেছি। শিক্ষা মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করে, কিন্তু সুশিক্ষা মানুষকে মানুষ হতে শেখায়। পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ববোধ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছাড়া কোনো শিক্ষাই পূর্ণতা পায় না। ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক সব দৃষ্টিকোণ থেকেই পিতা-মাতার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চে। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত এবং পিতা জান্নাতের মধ্যম দরজা। অথচ আধুনিকতার মোহে আমরা অনেকেই সেই মূল্যবোধ ভুলতে বসেছি।
এই সংকটের পেছনে কেবল ব্যক্তিগত উদাসীনতা নয়, বরং বহুমাত্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণও কাজ করছে। কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে অনেক সন্তান দেশবিদেশে চলে যাচ্ছে। ফলে পিতা-মাতারা গ্রামে বা শহরে একাকী জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন। প্রযুক্তির যুগে যোগাযোগ সহজ হলেও হৃদয়ের দূরত্ব অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে গেছে। ফোনে খোঁজ নেওয়া বা টাকা পাঠানোকে অনেকে যথেষ্ট দায়িত্ব পালন বলে ভাবেন। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অর্থ নয়, বরং সঙ্গ, ভালোবাসা, নিরাপত্তা এবং মানসিক প্রশান্তি। একজন বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানের মুখ দেখতে চান, তার সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে চান, নিজের সুখদুঃখ ভাগাভাগি করতে চান। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ মানুষ দিনের পর দিন একা ঘরে বসে অপেক্ষা করেন সন্তানের একটি ফোনকলের জন্য। সমাজে প্রতিযোগিতা ও ভোগবাদী মানসিকতার প্রসারও এই সমস্যাকে তীব্র করেছে। আজকের পৃথিবীতে ব্যক্তিগত সাফল্যকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যে পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় স্থানে চলে গেছে। সন্তানদের অনেকেই মনে করেন, পিতা-মাতার জন্য অর্থ ব্যয় করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। কিন্তু একজন মা-বাবা সন্তানের কাছ থেকে শুধু আর্থিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন না, তাঁরা চান আবেগের বন্ধন অটুট থাকুক। একজন মা তাঁর সন্তানের জন্য অসংখ্য নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন, নিজের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা বিসর্জন দিয়েছেন। একজন বাবা নিজের কষ্ট আড়াল করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য সংগ্রাম করেছেন। সেই ত্যাগের প্রতিদান কখনো অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তাই বৃদ্ধ বয়সে তাদের একাকিত্ব শুধু একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য অনেক পরিবার বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার পথ বেছে নিচ্ছে। বাস্তবতা হলো, কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধাশ্রম প্রবীণদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। সেখানে চিকিৎসা, খাদ্য, বাসস্থান এবং কিছু সামাজিক সঙ্গের ব্যবস্থা থাকে। অনেক স্বেচ্ছাসেবী ও মানবিক মানুষ নিজেদের উদ্যোগে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। তবে বৃদ্ধাশ্রম যত উন্নতই হোক, সেখানে সন্তানের স্নেহ, নাতিনাতনির হাসি কিংবা পরিবারের উষ্ণতা পাওয়া যায় না। একজন মা বৃদ্ধাশ্রমের বিছানায় শুয়ে সন্তানের শৈশবের স্মৃতি মনে করেন, তার সাফল্যের জন্য দোয়া করেন এবং অপেক্ষা করেন কখন সন্তান এসে তাকে একবার জড়িয়ে ধরবে। অনেক প্রবীণ মানুষ আছেন, যাঁদের সন্তানরা বিদেশে বা দেশের অন্য শহরে থাকে, তাঁরা বছরের পর বছর সন্তানদের দেখা পান না। তবু তাঁদের মুখে সন্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ খুব কমই শোনা যায়। বরং তাঁরা সন্তানের সুখ, সুস্থতা ও সফলতার জন্য দোয়া করেন। এটি পিতা-মাতার ভালোবাসার অনন্য বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর অন্য কোনো সম্পর্ক এত নিঃস্বার্থ নয়। তাই বৃদ্ধাশ্রম কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সামাজিক সেবা হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই সন্তানের দায়িত্বপালনের বিকল্প নয়। প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সহায়তা অবশ্যই বাড়াতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে পারিবারিক বন্ধনও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ মানুষ শুধু খাদ্য ও চিকিৎসা নিয়ে বাঁচে না, ভালোবাসা, সম্মান এবং আপনজনের উপস্থিতিও তার জীবনের অপরিহার্য উপাদান। এই সংকট থেকে উত্তরণে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত পরিবারে ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ এবং পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, চরিত্র গঠন ও মানবিক শিক্ষা গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। দ্বিতীয়ত সন্তানদের বুঝতে হবে যে পিতা-মাতা কোনো বোঝা নন, বরং তাঁরা আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁরা যে যত্ন ও ভালোবাসা প্রত্যাশা করেন, তা তাঁদের ন্যায্য অধিকার। তৃতীয়ত রাষ্ট্রকে প্রবীণ কল্যাণমূলক কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। চতুর্থত বিদেশে বা দূরে অবস্থানকারী সন্তানদের নিয়মিত যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ নিশ্চিত করার ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে আজ যাঁরা বৃদ্ধ, একদিন তাঁরাই আমাদের হাত ধরে চলতে শিখিয়েছেন। সময়ের চক্রে আমরাও একদিন বৃদ্ধ হব।
তখন আমাদের সন্তানরা আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে, তার ভিত্তি অনেকাংশেই তৈরি হবে আজ আমরা আমাদের পিতা-মাতার সঙ্গে কেমন আচরণ করছি তার ওপর। তাই কেবল উচ্চশিক্ষিত নয়, সত্যিকার অর্থে সুশিক্ষিত ও মানবিক মানুষ হওয়াই সময়ের দাবি। পিতা-মাতার মুখের হাসি, তাঁদের মানসিক প্রশান্তি এবং জীবনের শেষ সময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই সন্তানের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও গৌরব। যে সমাজ তার প্রবীণদের সম্মান করতে জানে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে সভ্য, মানবিক এবং উন্নত সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
♦ লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়