মুফতি সাঈদ আহমাদ
একসময় মানুষ পকেটে টাকা রাখত, এখন পকেটে পৃথিবী রাখে। একটি ছোট ডিভাইস—মোবাইল ফোন। এর ভেতরে আছে কোরআন, হাদীস, জ্ঞান, দাওয়াত, ইসলামী বই, আলেমদের বয়ান, পৃথিবীর হাজারো উপকারী বিষয়।
আবার এর ভেতরেই আছে পর্নোগ্রাফি, ব্যভিচার, গীবত, মিথ্যা, শিরক, কুফর, নাস্তিকতা, জুয়া, সুদ, অশ্লীলতা এবং অসংখ্য ফিতনা। অর্থাৎ এটি এমন একটি বস্তু, যার মাধ্যমে একজন মানুষ জান্নাতের পথও খুঁজে পেতে পারে, আবার জাহান্নামের পথও।
রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন—
«لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ»
‘কিয়ামতের দিন বান্দার দুই পা এক চুলও নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে—তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে।’
প্রথমত, আজ আমি আপনাদের সামনে একটি ভয়ঙ্কর হিসাব রাখতে চাই। ধরে নিন, একজন মানুষ প্রতিদিন মাত্র ৪ ঘণ্টা মোবাইল ব্যবহার করে। অনেকেই এর চেয়ে বেশি করেন।
৪ ঘণ্টা×৩৬৫ দিন= ১৪৬০ ঘণ্টা। এটি দিনে হিসাব করলে প্রায় ৬১ দিন। অর্থাৎ বছরে দুই মাসেরও বেশি সময় সে শুধু মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে কাটিয়েছে। ১০ বছরে ৬১০ দিনের বেশি। প্রায় ১ বছর ৮ মাস। ২০ বছরে সাড়ে ৩ বছরেরও বেশি।
ভাবুন তো, আল্লাহ আমাদের ৬০ বছরের জীবন দিলেন, আর তার মধ্যে ৪-৫ বছর শুধু স্ক্রিনের সামনে চলে গেল! এই সময়ের মধ্যে কত কোরআন খতম করা যেত! কত হাদীস শেখা যেত! কত ইলম অর্জন করা যেত! কত সন্তানকে মানুষ করা যেত! কত মানুষকে দাওয়াত দেয়া যেত! কত কান্না করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া যেত!
কিন্তু আমরা কী করেছি। একটি ভিডিও শেষ করেছি, আরেকটি শুরু করেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। শয়তান কখনো আমাদের বলে না- ‘চলো, জাহান্নামে যাও।’ সে শুধু বলে- ‘আরেকটা ভিডিও দেখো। আর পাঁচ মিনিট।’ এই ‘আর পাঁচ মিনিট’ একদিন পাঁচ বছর হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, একজন যুবক ফজরের পর ঘুম থেকে উঠে মোবাইল হাতে নিলো, দুই মিনিটের জন্য। হঠাৎ দেখে এক ঘণ্টা চলে গেছে। কোনো উপকার নেই। কোনো ইবাদত নেই। কোনো ইলম নেই। শুধু সময় গেছে। আর সময়ই হলো মানুষের সবচেয়ে বড় মূলধন। টাকা হারালে টাকা ফিরে আসে। স্বাস্থ্য হারালে কখনো কখনো স্বাস্থ্যও ফিরে আসে। কিন্তু সময় এক সেকেন্ডও ফিরে আসে না। দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী মানুষও গতকালের একটি মিনিট কিনতে পারবে না।
আজ যদি আল্লাহ আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন- ‘আমি তোমাকে যে ২৪ ঘণ্টা দিয়েছিলাম, তার কতটুকু আমার জন্য ছিল, আর কতটুকু স্ক্রিনের জন্য ছিল?’ আমরা কী উত্তর দেবো?
তৃতীয়ত, আমাদের ফোনের ব্যাটারির চার্জ শেষ হলে আমরা উদ্বিগ্ন হই। কিন্তু জীবনের চার্জ যে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তার চিন্তা কি করি? আমরা ফোনের স্টোরেজ ভরে গেলে অস্থির হয়ে যাই। কিন্তু আমলনামায় কী জমা হচ্ছে, তা কি কখনো দেখি?
আমরা ফোন আপডেট করি। কিন্তু ঈমান আপডেট করি কতবার? আমরা ফোনে পাসওয়ার্ড দিই, কিন্তু চোখ, কান ও হৃদয়কে গুনাহ থেকে রক্ষার জন্য কোনো পাহারা বসাই কি?
মনে রাখবেন কিয়ামতের দিন মোবাইল ফোনের ওজন বহন করতে হবে না। কিন্তু মোবাইলের মাধ্যমে দেখা প্রতিটি দৃশ্য, শোনা প্রতিটি শব্দ, লেখা প্রতিটি বাক্য, ছড়ানো প্রতিটি পোস্ট, নষ্ট করা প্রতিটি মিনিট—সবকিছুর হিসাব বহন করতে হবে।
দুনিয়াতে মোবাইল বহন করা সহজ, কিন্তু আখিরাতে মোবাইলের দায়ভার বহন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।
লেখক : মুদাররিস, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া ও প্রিন্সিপাল, মাদরাসাতুল কুরআন লিল-বানাত