দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। ২০৯টি আসন পেয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি সংসদের দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভের কৃতিত্ব অর্জন করেছে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। এই ভূমিধস বিজয়ের পেছনে রয়েছে শহীদ জিয়া ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিপুল জনপ্রিয়তা। এই সঙ্গে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে অর্জিত তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা। এসব কিছুর পরেও এই বিপুল বিজয়ের পেছনে যে ফ্যাক্টরটি কাজ করেছে সেটি হলো বিএনপির মার্কা বা প্রতীক ধানের শীষ। এবারে নির্বাচনে দেখা গেছে যে, ভোটারগণ অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীর নাম বা পরিচয় জানেন না। কিন্তু তিনি এসেছেন ধানের শীষে ভোট দিতে এবং ধানের শীষে ভোট দিয়ে চলে গেছেন। এভাবেই এবার ভূমিধস জয় পেয়েছেন তারেক রহমান এবং তার দল বিএনপি।
নির্বাচনে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তারেক রহমান এবং বিএনপির ওপর আস্থা স্থাপন করেছেন। কিন্তু কতিপয় মন্ত্রীর বা বিএনপির উচ্চস্তরের নেতার অসংলগ্ন, অজ্ঞতাজনিত এবং জনগণের সেন্টিমেন্ট বিরোধী উক্তির ফলে সেই আস্থায় যেনো চিড় না ধরে সেটি দেখার দায়িত্ব বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের।

আমরা লক্ষ করছি যে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার মাত্র ৪ দিনের মাথায় বিএনপির সর্বোচ্চ বডি স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ‘ইনকিলাব’ শব্দটি নিয়ে এমন উক্তি করেছেন, যা ভাষা বিশেষ করে এই শব্দটি নিয়ে তাঁর জ্ঞানের গভীরতার ঘাটতি প্রকাশ করে। সিরাজগঞ্জে শহীদ দিবসের এক আলোচনা সভায় তিনি যা বলেছেন সেটি গত ২২ ফেব্রুয়ারি রবিবার দৈনিক ইনকিলাবের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে। এসম্পর্কে ইনকিলাবে যে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে তার শিরোনাম হলো, ‘টুকুর ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বিরোধী মন্তব্য ঘিরে বিএনপির ঘরে বাইরে ব্যাপাক ক্ষোভ, উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া’। খবরে বলা হয়, ‘শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক আলোচনা সভায় ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আজকের জেন-জি যদি ইনকিলাব বলে, তবে আমার রক্তক্ষরণ হয়। বাংলাকে ধারণ করতে হলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। এগুলো তাদের ভাষা যারা আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, এই মন্তব্যের জন্য তাকে ‘ভারতের দালাল’ বলা হলেও তিনি পরোয়া করেন না।’
ইনকিলাবের ঐ খবরে আরো বলা হয়, ‘টুকুর এই মন্তব্যের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তার এই মন্তব্যকে তরুণ প্রজন্ম ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ’ হিসেবে দেখছে, যার ফলে ফেসবুকজুড়ে এখন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। নেটিজেনরা পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলছেন, যে ভাষায় কথা বললে হিন্দুত্ববাদের দালালদের অন্তর জ্বলবে, সেটাই এখন প্রতিরোধের ভাষা। তারা ইতিহাস তুলে ধরে বলছেন, ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’, ‘ইনসাফ’ ও ‘মজলুম’ শব্দগুলো যেকোনো মুক্তি-সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা। তাই তাকে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অবশ্য এর আগেও বেগম জিয়ার মন্ত্রিসভায় (২০০১ থেকে ২০০৬) তিনি একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তখন তিনি স্ট্যান্ডিং কমিটির মেম্বার ছিলেন না। সময়ের আবর্তনে স্বাভাবিকভাবেই তিনি সিনিয়র হয়েছেন এবং জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেজন্যই চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য নিয়োগ দিয়েছেন। সেই টুকু সাহেব যখন ইনকিলাব জিন্দাবাদের সমালোচনা করেছেন তখন প্রথমে আমরাই কিছুটা বিব্রত হয়েছি। কারণ বিগত ৪০ বছর ধরে ‘দৈনিক ইনকিলাব’ বাংলাদেশের অন্যতম নেতৃস্থানীয় দৈনিক হিসাবে দেশবাসীর সেবা করে আসছে। তাই বিদ্যুৎ মন্ত্রীর ঐ সমালোচনার তীর যে সর্বপ্রথম আমাদের দিকেই ছুটে আসে, সেকারণেই বিব্রত বোধ করি।
বিদ্যুৎ মন্ত্রী জানেন যে, পাকিস্তান আন্দোলনে যে বাংলা দৈনিকটি ভারতবর্ষের মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাস ভূমি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সহযোদ্ধা ছিলো তার নাম ‘দৈনিক আজাদ’। আজাদ শব্দটি অবশ্যই বাংলা নয়। অবিভক্ত ভারতে মুসলিম লীগের মুখপাত্র না হয়েও মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাস ভূমির পক্ষে যে পত্রিকাটি আওয়াজ তুলেছিলো তার নাম ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’। ইত্তেহাদ শব্দটি অবশ্যই বাংলা শব্দ ছিলো না। সম্পাদক ছিলেন আবুল মনসুর আহমেদ। তিনি বর্তমানে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘ডেইলি স্টারের’ প্রকাশক ও সম্পাদক মাহফুজ আনামের পিতা। পাকিস্তানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আবুল মনসুর আহমেদ তার মন্ত্রিসভায় একজন পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন। তার লিখিত রাজনৈতিক গ্রন্থ ‘আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর’ একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ সচেতন মহলের অবশ্যই পাঠ্য।

॥দুই॥
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় দৈনিক আজাদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। এর সম্পাদক ছিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন। এছাড়া ৫০ এর দশকে ঢাকার কারকুন বাড়ি লেন থেকে প্রকাশিত হয় ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’। এছাড়া ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন রোড থেকে প্রকাশিত হয় ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। ‘দৈনিক আজাদের’র পর দৈনিক ইত্তেফাকই বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন বাংলা দৈনিক। ইত্তেফাক অবশ্যই বাংলা শব্দ নয়। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ইত্তেফাকে কলাম লিখতেন ‘মুুসাফির’ ছদ্ম নামে। মুসাফির শব্দটিও অবশ্যই বাংলা নয়। পুরানা পল্টন থেকে প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’। মালিক সম্পাদক ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিক অলি আহাদ।

এবার রাজনৈতিক অঙ্গনে আসি। টুকুর পিতা ছিলেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার মন্ত্রী ছিলেন। মুসলিম লীগের কোন শব্দটি বাংলা? বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ দল (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগ। এই আওয়ামী লীগ যে দুটি শব্দ নিয়ে গঠিত তার কোন শব্দটি বাংলা? উর্দু শব্দ আওয়াম থেকে এসেছে আওয়ামী লীগ। আওয়াম মানে জনতা, আমরা যাকে এখন বলি আম জনতা।

অতদূর যাবো কেনো? তাকান টুকু সাহেবের দলটির দিকে। নাম ‘বিএনপি’। এই তিনটি অক্ষরই ইংরেজি। এর পূর্ণ নাম হলো বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি। এই তিনটি শব্দের মধ্যে দুইটিই তো ইংরেজি।
এবার আসছি বিএনপি তথা সরকারের জাতীয় স্লোগান নিয়ে। আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান হলো, ‘জয় বাংলা’। যখন তারা ক্ষমতায় যায় তখনও রাষ্ট্রীয় স্লোগান হয় জয় বাংলা। পরের স্লোগান হলো, বাংলাদেশ ‘চিরজীবী হোক’। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের পতনের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ প্রেসিডেন্ট হয়ে রাষ্ট্রীয় স্লোগান জয় বাংলা বদলে করেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। মোশতাকের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান এসেও ঐ ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি বিএনপির স্লোগান এবং রাষ্ট্রের দলীয় স্লোগান হিসেবে অপরিবর্তিত ও অব্যাহত রাখেন।
ওপরে অনেকগুলো উদাহরণ দিলাম। এখন বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলুন, ঐ সব ইংরেজি বা উর্দু শব্দের কোনটির তিনি বাংলা করবেন?

॥তিন॥
এখন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ প্রসঙ্গ। ইনকিলাব শব্দটি এসেছে আরবি ইনকিলাব থেকে। পরবর্তীতে উর্দু এবং ফার্সি ভাষার মাধ্যমে ভারতীয় রাজনীতিতে শব্দটি জনপ্রিয় হয়। ইনকিলাব অর্থ বিপ্লব। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এটি ছিলো একটি বিপ্লবী স্লোগান। এই ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি উচ্চারিত হয় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক ভগত শিংয়ের কণ্ঠে। তিনি হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের বিপ্লবী নেতা ছিলেন। এছাড়ও এটিকে জনপ্রিয় করেন কবি ও নেতা মওলানা হাসরাত মোহানি। ভারতের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতারা ভারত বিভক্তির অব্যবহিত পর স্লোগান দেন, ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়/ লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’
১৯২৯ সালে ভগত সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লির সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমা হামলার পর এই স্লোগানটি তুমুল জনপ্রিয় করেন, যা ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম ও বৈষম্যবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।

॥চার॥
ইনকিলাব এবং জিন্দাবাদ, এই দুটি শব্দ নিয়ে আর কত আলোচনা করবো। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ইসলামী বিপ্লবের কবি ফররুখ আহমেদ, বিশিষ্ট কবি আল মাহমুদ প্রমুখ তাদের কবিতায় ও গদ্যে খুন, ইনসাফ, ফয়সালা, শহীদ ইত্যাদি অসংখ্য শব্দ তাদের রচনায় ব্যবহার করেছেন। আমি আজকের এই লেখায় আগাগোড়া চেষ্টা করেছি যাতে করে এটি পান্ডিত্যপূর্ণ না হয় এবং সহজবোধ্য হয়। তবে এতটুকু বলতেই হবে যে, শুধু বাংলা ভাষাই নয়, ইংরেজি ভাষাতেও অনেক বিদেশি শব্দ ঢুকেছে। এসব বিদেশী শব্দ ভাষার মধ্যে ঢুকে সেই ভাষাকে বরং ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। চেয়ার টেবিল তো ইংরেজি শব্দ। টেলিফোনের বাংলা কেউ কেউ করেছিলেন দুরালাপনী। কিন্তু চলেনি। মানুষ গ্রহণ করেনি। এই যে আমরা ইংরেজি বলার সময় বলি ডি ফ্যাক্টো, ডি জ্যুরি, এটসেটরা- ইত্যাদিসহ শত শত গ্রিক, ল্যাটিন শব্দ ইংরেজি ভাষায় ঢুকেছে। এগুলো ঢুকে তো ইংরেজি ভাষাকে সমৃদ্ধ হয়েছে।
এই যে আমরা ভালো ভালো ঘরবাড়ি বানিয়ে নাম দেই ম্যানশন, লজ, কটেজ, মহল ইত্যাদি। এগুলো কি একটাও বাংলা শব্দ? বিদ্যুৎ মন্ত্রীর সুপারিশ মানতে গেলে তো শত শত এই ধরনের বিদেশি শব্দকে ঝেঁটিয়ে বাংলা বা ইংরেজি ভাষা থেকে বিদায় করতে হয়। সেটি কি সম্ভব? নাকি জনগণ সেগুলো গ্রহণ করবেন?

আমার মনে হয়, যার যেটা সাবজেক্ট নয়, তার সেই বিষয়ে কথা বলা উচিত নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত তিনি তার বক্তব্য সম্পর্কে একশত ভাগ সঠিক এবং নিশ্চিত না হন। কারণ, এ ধরনের অপরিপক্ক উক্তির দায় কিন্তু চূড়ান্ত পরিণামে সরকার প্রধানকেই বহন করতে হয়।

Email:[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews