ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের গভীরে পাহাড়ের ওপর গড়ে উঠেছে ইসরায়েলি সেটলার বা বসতি স্থাপনকারীদের অবৈধ আস্তানা ‘হাভাত গিলাদ’। এর আশপাশের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলো থেকে সেখানে থাকা টিনের চালা ও সাধারণ পাকা ঘরগুলো স্পষ্ট দেখা যায়।

শুক্রবার (৩১ জুলাই) তাল নামক গ্রামে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের মধ্যকার এক সংঘর্ষে হাভাত গিলাদের এক ইসরায়েলি নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। ঘটনাটির মূল কারণ নিয়ে মতভেদ থাকলেও ওই সংঘর্ষে চার ফিলিস্তিনি ও এক ইসরায়েলি সেনাও প্রাণ হারান। এই ঘটনা কেন্দ্র করে ওই এলাকার ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে চরমপন্থি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ভয়াবহ হামলা চালান।

হাভাত গিলাদের চারপাশের ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কয়েক দিন কথা বলার পর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র দল সরাসরি ওই অবৈধ ইসরায়েলি আস্তানায় প্রবেশ করে। উদ্দেশ্য ছিল, সেখানকারই এক বাসিন্দার কাছে এসব সহিংসতা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া।

আন্তর্জাতিক কোনো সংবাদমাধ্যমের জন্য এই ধরনের অননুমোদিত আস্তানায় ঢোকার অনুমতি পাওয়া অত্যন্ত বিরল। তবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ইসরায়েলিদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংগঠনের আইনজীবী ইহুদা শিমোন ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হন।

তিনি স্পষ্ট জানান যে, অবৈধ আস্তানার নিরাপত্তারক্ষী নিহতের প্রতিশোধ হিসেবে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে চালানো সাম্প্রতিক সব হামলা পুরোপুরি যৌক্তিক। তিনি হাভাত গিলাদের সবচেয়ে কাছের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর নাম উল্লেখ করে বলেন, আমি মনে করি, তারা একজন ইসরায়েলিকে হত্যা করার পর আমাদের উচিত তাল, সাররা, এমনকি জিত ও ফারাতা গ্রামের সব মানুষকে হত্যা করা।

তখন তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, তিনি কি তবে একজন ইহুদির জীবনের সঙ্গে শত শত বা হাজার হাজার ফিলিস্তিনির জীবনকে সমান হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন? জবাবে তিনি বলেন, না, লাখ লাখ ফিলিস্তিনির সমান। একজন ইহুদির জীবন হলো ১ কোটি ফিলিস্তিনির সমান।

তার এই চরম বর্ণবাদী বক্তব্যের বিষয়ে বিবিসির প্রতিনিধিরা তাকে চেপে ধরলে ইহুদা শিমোন তার বক্তব্য অস্বীকার তো করেনইনি, বরং গর্বের সঙ্গে বলেন, হ্যাঁ, আমি জানি। কিন্তু এটাই সত্যি, কারণ ঈশ্বর আমাদের বেছে নিয়েছেন ও এই কারণেই আপনারা আমাদের প্রতি হিংসা করেন।

পশ্চিম তীরজুড়ে চলমান সহিংসতার নেপথ্য প্রেক্ষাপট বুঝতে এই উগ্রবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা সাধারণ অনেক ইসরায়েলিও প্রত্যাখ্যান করেন। বিশেষ করে, হাভাত গিলাদের মতো অননুমোদিত আস্তানার অনেক বসতি স্থাপনকারী মনে করেন, পশ্চিম তীর হলো সেই পবিত্র ভূমি যা তাদের ঈশ্বর ইহুদিদের জন্য উপহার দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ইসরায়েলের অফিসিয়াল বসতি ও অননুমোদিত এই আস্তানাগুলোর প্রতিটিই আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সম্পূর্ণ অবৈধ।

দুই দশকেরও বেশি সময় আগে ফিলিস্তিনিদের হাতে নিহত এক ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তার স্মরণে নির্মিত হয়েছিল হাভাত গিলাদ। উঁচুতে অবস্থিত এই আস্তানায় রয়েছে কয়েকটি ছড়ানো-ছিটানো ঘরবাড়ির সারি ও একটি আঙ্গুর বাগান।

তবে সাম্প্রতিক পরিদর্শনের সময় প্রবেশপথের কাছেই পুড়ে যাওয়া কয়েকটি নতুন ভবনের সারি দেখা যায়। শিমোনের দাবি, ফিলিস্তিনিদের অগ্নিসংযোগের কারণেই এগুলো পুড়েছে। যদিও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গাড়ির জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলা সিগারেটের টুকরো থেকে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ও পুলিশ এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবেই গণ্য করছে।

ইসরায়েল সরকার এর আগে হাভাত গিলাদকে বৈধতা দেওয়ার কথা বলেছিল। তবে ইসরায়েলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘পিস নাও’ জানায়, এই আস্তানাটি যে জমির ওপর নির্মিত, তার বড় অংশই বেসরকারিভাবে ফিলিস্তিনিদের মালিকানাধীন জমি হিসেবে চিহ্নিত। ফলে সেখানে বৈধতা দিতে না পেরে সরকার এর ঠিক দক্ষিণে রাষ্ট্রীয় জমি হিসেবে ঘোষিত এলাকায় নতুন বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দিচ্ছে।

তবে আন্তর্জাতিক আইন বা মালিকানার বিষয়গুলোকে সরাসরি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেন শিমোন। তার মতে আন্তর্জাতিক আইন অর্থহীন, কারণ বাইবেলই ইহুদিদের পশ্চিম তীরের ভূমির অধিকার দিয়েছে। বর্তমান ইসরায়েল সরকারের অধীনে বসতির নজিরবিহীন বিস্তার ও মন্ত্রিসভায় চরম ডানপন্থি ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী মন্ত্রীদের দাপট থাকা সত্ত্বেও শিমোন তার দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর সমালোচনা করেন। ফিলিস্তিনিদের প্রতি তারা যথেষ্ট কঠোর নয় বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।

শিমোন বলেন, ইসরায়েল সরকার ও সেনাবাহিনী জাতিসংঘকে বেশি তোষামোদ করে। ফিলিস্তিনি ও ইহুদিদের মধ্যে সংঘর্ষ হলে তারা ফিলিস্তিনিদের হত্যা না করে কেবল আলাদা করে দেয়। পরে সেই ফিলিস্তিনিরাই আমাদের হত্যা করে।

যদিও পশ্চিম তীরে হতাহতের পরিসংখ্যান তার এই দাবির সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র তুলে ধরে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (OCHA)-এর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ৬৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৮ জনই মারা গেছেন উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের সরাসরি হামলায়।

অন্তত ১২ জন ফিলিস্তিনি সরাসরি বসতি স্থাপনকারীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন, ৩ জন ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ও বাকি ৩ জনের ক্ষেত্রে সেনা নাকি বসতি স্থাপনকারী দায়ী- তা এখনো অস্পষ্ট। বিপরীতে একই সময়ে মাত্র ১ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। এছাড়া এই বছর বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় আহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে প্রতিদিন গড়ে তিনজনেরও বেশি হয়েছে।

সম্প্রতি পশ্চিম তীরে দায়িত্ব পালন করা এক ইসরায়েলি সেনা জানান, তিনি সব সময় ফিলিস্তিনিদের মুখে চরম আতঙ্ক দেখেছেন, কিন্তু সেখানকার কোনো ইহুদির মুখে কখনোই ভয়ের লেশমাত্র দেখেননি।

বিবিসি প্রতিনিধি শিমোনকে এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি উল্টো বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে ফিলিস্তিনিদের শেখানো গল্প গিলে খাওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, এলাকার প্রতিটি ফিলিস্তিনির কাছে দুটি করে অস্ত্র রয়েছে ও তারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের মতো হামলা চালাতে প্রস্তুত হচ্ছে। শিমোন চরম হুমকি দিয়ে বলেন, আমরা যদি জেগে উঠে তাদের এই পুরো এলাকা, সমগ্র ইসরায়েল ও গাজা থেকে বিতাড়িত না করি, তবে তারা বারবার ফিরে আসবে।

বাস্তবতা হলো, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদার ও ফিলিস্তিনি অধিবাসীদের মধ্যকার এই সংঘাত কোনো সমশক্তির লড়াই নয়। ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর থেকে ভূখণ্ডটি দখল করে শত শত অবৈধ বসতি গড়ে তুলেছে ইসরায়েল, যেখানে এখন ৫ লাখেরও বেশি ইহুদি বাস করে।

এই বসতি স্থাপনকারীদের রক্ষা করে শক্তিশালী ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও তাদের নিজস্ব সশস্ত্র রক্ষীবাহিনী। সেখানে থাকা ইসরায়েলিরা বেসামরিক আইন ও পূর্ণ চলাচলের স্বাধীনতা ভোগ করেন, যেখানে ফিলিস্তিনিদের সামরিক শাসন, সামরিক আদালত ও কঠিন সামরিক তল্লাশিচৌকির সম্মুখীন হতে হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইসরায়েলে এই আচরণকে ‘বর্ণবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে ইসরায়েল এই তকমাকে অবান্তর বলে দাবি করে আসছে।

পশ্চিম তীরের সাধারণ ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের পরিণতি কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে শিমোন তিনটি বিকল্প তুলে ধরেন: ১. ইসরায়েলি শাসন ও জমিন মেনে নিয়ে শান্তিতে থাকা, ২. স্বেচ্ছায় অন্য কোনো আরব বা মুসলিম দেশে চলে যাওয়া এবং ৩. যদি তারা আমাদের সঙ্গে শান্তি না চায় ও চলেও না যায়, তবে আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না- তাদের সবাইকে হত্যা করতে হবে।

এই উগ্রপন্থি বসতি স্থাপনকারীর রূপরেখাটি বর্তমানে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোৎরিচ-এর ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি ব্লুপ্রিন্টের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। সরকারে যোগ দেওয়ার আগে দেওয়া সেই পরিকল্পনায় স্মোৎরিচ বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের আশা ছেড়ে ইসরায়েলি শাসনে শান্তিতে থাকতে হবে, জাতীয়তাবাদী আবেগ ছাড়তে না পারলে দেশ ছাড়তে হবে, আর যারা সশস্ত্র সংগ্রাম চালাবে তাদের সেনাবাহিনী দিয়ে হত্যা করা হবে।

সম্প্রতি মন্ত্রী হিসেবে স্মোৎরিচ গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায় স্থানান্তর’ ও সেখানে পুনরায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের উস্কানি দিয়েছেন ও ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিচয়কে একটি ‘কাল্পনিক উদ্ভাবন’ বলে অভিহিত করেছেন।

হাভাত গিলাদের ঠিক বিপরীতে দৃশ্যমান এক ফিলিস্তিনি নারী জানান, বসতি স্থাপনকারীদের হঠাৎ আক্রমণের ভয়ে তিনি প্রতিনিয়ত জানালার বাইরে নজর রাখেন। অন্যান্য সাধারণ ফিলিস্তিনিরাও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কেবল বসতি স্থাপনকারীদের পাহারা দেয়, তাদের নিজস্ব কোনো নিরাপত্তা নেই এবং বিশ্ব সম্প্রদায় তাদের পুরোপুরি ত্যাগ করেছে।

এক হতাশ ফিলিস্তিনি নাগরিক আক্ষেপ করে বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ইউরোপ নিজেদের ব্যস্ত, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে নিয়ে চিন্তিত, চীনের কোনো তোয়াক্কা নেই, রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে লড়ছে, জাতিসংঘ শেষ হয়ে গেছে ও আরব বিশ্ব নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত। আমরা জানি না আমাদের এখন কী করা উচিত।

হাভাত গিলাদ থেকে নিকটতম ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর দূরত্ব এক মাইলেরও কম, কিন্তু ইসরায়েলি আইন, সামরিক শক্তি ও দুই পক্ষের গভীর শত্রুতার কারণে এই প্রান্তর আজ চরমভাবে বিভক্ত ও রক্তস্নাত।

সূত্র: বিবিসি



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews