দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। শীতে এমনিতেই কাজ কমে যায়। প্রতি বছর শীতে সরকারের রাস্তাঘাট সংস্কার ও নির্মাণ কার্যক্রম চলে। এসব কর্মসূচিতে কর্মজীবী মানুষ কাজ পায়। এবার সেই সুযোগও কম। অর্থাভাবে সরকার উন্নয়ন কার্যক্রম সেভাবে চালাতে পারছে না, যাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কাজকর্ম কমে যাওয়ায় দরিদ্র ও কর্মজীবী মানুষের চুলায় হাঁড়ি চড়ছে না ঠিকমতো। এ মুহূর্তে শীতার্ত মানুষের জন্য সব থেকে বেশি প্রয়োজন শীতবস্ত্র ও খাদ্য। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শীতকাতর মানুষের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। অসহনীয় শীতের কারণে ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, সর্দি, কাশিসহ ভাইরাসজনিত রোগ বেড়ে যায়। এ অবস্থায় ঠান্ডা থেকে শিশু ও বয়স্কদের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। ঠান্ডার কারণে শিশু ও বয়স্কদের হালকা গরম পানি সেবন করানো উচিত। শীতকালে ফুসফুসে জীবাণু সংক্রমণের হার বেড়ে যায়। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। শীতে বয়োজ্যেষ্ঠ ও শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে তা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আগে থেকে যারা অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস শ্বাসরোগে ভুগছে তাদের রোগ শীতে জটিল হয়ে ওঠে। শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ও জীবাণু বহনকারী রোগীদের যত্রতত্র কাশি না দেওয়াই উচিত। আর কেউ কাশি দিলে মুখ ডেকে আড়াল করে দেওয়া ভালো। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় শীতে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে গরিব-দুঃখী মানুষের জীবনযাত্রা। সকালে তীব্র শীতে কাজে বের হতে পারছেন না তারা। বিকাল থেকেই তাপমাত্রা নিম্নগামী হওয়ায় সন্ধ্যার পরপরই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট, হাটবাজার ও দোকানপাট। খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না মানুষ। গরম কাপড়ের অভাবে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ। কাজে বের হতে না পারায় পরিবারপরিজন নিয়ে শ্রমজীবী মানুষ অনাহার-অর্ধাহারে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। শীতার্তদের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হয়েছে সরকারি উদ্যোগে। তবে চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় তা পৌঁছাচ্ছে না গরিবদুঃখী সব মানুষের কাছে।
একদিকে প্রচণ্ড শীত অন্যদিকে ঘনকুয়াশায় দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের জনজীবন কয়েক দিন ধরে স্তব্ধ প্রায়। ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় রাজধানী থেকে দক্ষিণাঞ্চলে সড়কপথে যাতায়াতে ৩ গুণেরও বেশি সময় লাগছে। তীব্র শীতে খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগসীমা অতিক্রম করতে চলেছে। শীতের কারণে কাজ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ছে। জুটছে না পেটের অন্ন। হাড়কাঁপানো শীত অসহায় জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। শীত গরিব মানুষের জীবনকে অসহনীয় অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। জনগণ আশা করে শীতপীড়িত মানুষের ত্রাণে সরকার কম্বল, গরম পোশাক বিতরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সমাজের সম্পন্ন মানুষদেরও শীতার্তদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। বাড়িয়ে দিতে হবে সহযোগিতার হাত। শৈত্যপ্রবাহ কৃষির জন্য যেসব হুমকি সৃষ্টি করছে তা রোধে কৃষি বিভাগ যথাযথ উদ্যোগ নেবে আমরা তেমনটিও দেখতে চাই।
মানুষ মানুষের ভাই। একজন মানুষ হয়ে আরেকজন অসহায় কর্ম অক্ষম মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই শীতে অসহায় গরিব বস্ত্রহীন কর্ম অক্ষম মানুষ কীভাবে রাত কাটাচ্ছেন। তাদের আমাদের মতো দামি গরম পোশাক তো দূরে থাক, সামান্য কাপড়টুকু নেই। ছোট ছোট বাচ্চারা এই তীব্র শীত এ কত কষ্টে আছে। অনেকে এই শীত সহ্য করতে না পেরে মারাও যাচ্ছে। তাই সবার প্রতি আহ্বান আসুন আমরা যে যা পারি তাই দিয়েই শীতার্তদের পাশে দাঁড়াই।
নবী করিম (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘এক মুসলমান অন্য মুসলমানকে কাপড় দান করলে আল্লাহ তাকে জান্নাতের পোশাক দান করবেন। ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাদ্য দান করলে আল্লাহ তাকে জান্নাতের সুস্বাদু ফল দান করবেন। কোনো মুসলমানকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি পান করালে আল্লাহ তাকে জান্নাতের সিলমোহরকৃত পাত্র থেকে পবিত্র পানি পান করাবেন’ (আবু দাউদ)।
শীত নিবারণে দুর্গত অঞ্চলে শীতবস্ত্র বা গরম কাপড়, ওষুধপত্র সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। দুর্যোগময় মুহূর্তে মনপ্রাণ খুলে আর্তমানবতার সেবায় সাহায্যের হাত বাড়ানো; খাদ্য, ওষুধ, পথ্য, শীতবস্ত্র এবং জরুরি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে যাওয়া এবং দুস্থ মানবতার সেবার মতো শ্রেষ্ঠ কর্মে অগ্রসর হওয়া জরুরি। সমাজের অসহায় ও শীতার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবারই নৈতিক দায়িত্ব। অসহায়দের সাহায্যে এগিয়ে আসার মাধ্যমেই রচিত হবে মানবিক সেতুবন্ধন। আমাদের সামান্য সহযোগিতা তাদের জীবনে এনে দিতে পারে এক টুকরো সুখ। কনকনে শীতে ঠকঠক করে কাঁপা মানুষের গায়ে শীতবস্ত্র জড়িয়ে তার মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে। এর মাধ্যমে প্রকাশ পায় মানুষের প্রতি আমাদের মমত্ব ও ভালোবাসার।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য