মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত যোগাযোগের ইতিহাস। আদিম মানব যখন গুহার দেওয়ালে চিত্র অঙ্কন করিত, তখনো তাহার উদ্দেশ্য ছিল-অভিজ্ঞতা ও বার্তা পরবর্তী প্রজন্মের নিকট পৌছানো। কালক্রমে সেই যোগাযোগ ডাকপিওনের ধীর পদচারণা অতিক্রম করিয়া টেলিগ্রাফ, টেলিফোন ও সম্প্রচারমাধ্যমে বিস্তৃত হইয়াছে। আজ আমরা উপস্থিত হইয়াছি ডিজিটাল যোগাযোগের যুগে, যেখানে এক ক্লিকে তথ্য ছড়াইয়া পড়ে লক্ষ মানুষের নিকট; কিন্তু এই দ্রুততার পাশাপাশি একটি গভীর প্রশ্ন অনিবার্য হইয়া উঠিয়াছে-মানুষের বিবেচনাবোধ ও যুক্তিবুদ্ধি কি সেই একই গতিতে পরিণত হইয়াছে?
দুঃখজনক বাস্তবতা হইল, প্রযুক্তির অগ্রগতি অনেক ক্ষেত্রেই মানবিক ও বৌদ্ধিক প্রস্তুতির চেয়ে বহু গুণ অগ্রসর। বিশেষত, তৃতীয় বিশ্বের সমাজসমূহে এই বৈষম্য প্রকট। যেইখানে শিক্ষার আলো এখনো সর্বত্র পৌঁছায় নাই, সেইখানে ডিজিটাল মাধ্যম হইয়া উঠিয়াছে এক দ্বিমুখী অস্ত্র। এক দিকে ইহা জ্ঞান ও তথ্যের দ্বার খুলিয়া দিয়াছে, অন্য দিকে খুলিয়া দিয়াছে বানোয়াট তথ্য, কল্পকাহিনি ও পরিকল্পিত প্রতারণার বিস্তীর্ণ পথ।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু চোখ রাখিলেই দেখা যায়-কোনো খ্যাতিমান চিকিৎসকের নাম ও ছবি ব্যবহার করিয়া উদ্ভট স্বাস্থ্য-পরামর্শ প্রচারিত হইতেছে। কোনো ফটোকার্ডে লেখা-অমুক খাবার খাইলেই ক্যানসার সারে, অমুক পানীয় পান করিলেই ডায়াবেটিস নির্মূল হয়। ইহার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই; অথচ কার্ডের নকশা ঝকঝকে, ভাষা প্রাঞ্জল, কখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নির্মিত। সাধারণ মানুষ এই সকল তথ্য যাচাই করিবার প্রয়োজন বোধ করেন না; বরং বিশ্বাস করিয়া শেয়ার করেন। এইভাবেই মিথ্যা তথ্য ভাইরাসের মতো ছড়াইয়া পড়ে।
এই প্রবণতা কেবল চিকিৎসাবিদ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে। ধর্মীয় ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক বক্তব্য, অর্থনৈতিক পূর্বাভাস-সর্বত্রই বানোয়াট তথ্যের দৌরাত্ম্য। কোথাও উদ্দেশ্য আর্থিক প্রতারণা, কোথাও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল, কোথাও সমাজে বিভাজন ও বিদ্বেষ সৃষ্টির নীলনকশা। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিছক 'রিচ' ও জনপ্রিয়তার লোভেও মানুষ মিথ্যার আশ্রয় লয়। লক্ষণীয় বিষয়, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও শক্তিশালী গণসচেতনতা যেই সকল দেশে বিদ্যমান, সেইখানে এই ধরনের প্রতারণা তুলনামূলকভাবে কম কার্যকর হয়। কারণ, সেইখানে মানুষ প্রশ্ন করিতে জানে-ইহার উৎস কী? প্রমাণ কোথায়?
বাংলা প্রবাদে বলা হয়-মানুষ ঠেকিয়া শিখে; কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্রবাদ ভয়ংকর অর্থ বহন করে। কারণ, প্রতিবার ঠকিবার মূল্য এখন আর সামান্য নহে। একটি ভুল চিকিৎসা-পরামর্শ প্রাণনাশের কারণ হইতে পারে। একটি মিথ্যা রাজনৈতিক প্রচারণা সমাজকে সহিংসতার দিকে ঠেলিয়া দিতে পারে। একটি গুজব অর্থনীতিতে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করিতে পারে। প্রশ্ন উঠিতেছে-এই দায় কাহার?
রাষ্ট্রযন্ত্র এই দায় এড়াইতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মালিকানাধীন করপোরেট সংস্থাগুলিও দায়মুক্ত নহে। যেই প্ল্যাটফরমে মিথ্যা ও বিপজ্জনক তথ্য ছড়াইতেছে, সেই প্ল্যাটফরমের কর্তৃপক্ষের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব রহিয়াছে তাহা শনাক্ত ও অপসারণ করা; কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়-অ্যালগরিদম সেই তথ্যকেই অগ্রাধিকার দেয়, যাহা অধিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মিথ্যা খবর উত্তেজনা জাগায়, আর উত্তেজনাই অ্যালগরিদমের খাদ্য। সত্য সাধারণত সংযত ও নিরুত্তাপ; ফলে তাহা চাপা পড়িয়া যায়।
এই বৈপরীত্য আধুনিক সভ্যতার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। প্রযুক্তি নিজে ভালো বা মন্দ নহে; তাহার ব্যবহারকারীই তাহার চরিত্র নির্ধারণ করে। অতএব একমাত্র টিকসই প্রতিকার হইল-সচেতনতা ও শিক্ষা। রাষ্ট্রীয় নীতিতে শিক্ষাকে কেবল পাঠ্যসূচির মধ্যে আবদ্ধ রাখিলে চলিবে না। আমাদের মনে রাখিতে হইবে-মিথ্যা তথ্য কেবল ব্যক্তিকে প্রতারিত করে না: সমাজের সিদ্ধান্ত ক্ষমতাকেও ভঙ্গুর করিয়া ফেলে। যেই সমাজ মিথ্যার ফাঁদে বন্দি, সেই সমাজ ভুল নীতি গ্রহণ করিবে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত করিবে। প্রযুক্তির জয় তখনই অর্থবহ, যখন মানুষ তাহা ব্যবহার করিবার মতো জ্ঞানী ও সচেতন হইবে। অন্যথায়, এই ডিজিটাল যুগই হইয়া উঠিবে সভ্যতার এক নূতন ফাঁদ।