ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে অব্যাহতভাবে পরিকল্পিত ‘প্রজনন গণহত্যা’ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। ইসরাইলিরা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, মা ও শিশুদের হত্যা এবং পরিবেশকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে যা ফিলিস্তিনিদের বন্ধ্যাত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনি নারীবাদী গোষ্ঠীর নতুন একটি প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইল এই বর্বরতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে, যার উদ্দেশ্য ফিলিস্তিন থেকে জীবনের চিহ্ন মুছে ফেলা।
জাতিসঙ্ঘের তদন্ত কমিটি নিশ্চিত করেছে, ইসরাইলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের টার্গেট করছে। স্নাইপার ও ড্রোন দিয়ে নিখুঁত নিশানা, বন্দিশালায় নির্যাতন, প্রজনন সহিংসতা এবং স্কুল-হাসপাতাল ধ্বংসের মাধ্যমে শিশুদের ওপর চরম আঘাত হানা হচ্ছে।
ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ২১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে এবং কমপক্ষে ১৫ হাজার শিশু তাদের মাকে হারিয়েছে। আল-নাসর শিশু হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় ইসরাইল। পরে হাসপাতালটির ইনকিউবেটরে থাকা চার শিশুর পচাগলা লাশ উদ্ধার করা হয়।
ফিলিস্তিনি নারীবাদী গোষ্ঠী ১৮৮ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম ‘একটি শিকারী রাষ্ট্র : ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের পদ্ধতিগত যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’।
এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি নারীদের ওপর পদ্ধতিগত যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা চালাচ্ছে ইসরাইল। পানি ও স্যানিটারি পণ্য আটকে দেয়ায় তীব্র সঙ্কটে পড়েছেন নারীরা। বোমাবর্ষণে ধ্বংস হওয়া হাসপাতালে জ্বালানি, বিদ্যুৎ বা চেতনানাশক কিছুই নেই।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অ্যানেস্থেশিয়া ছাড়াই সেখানে সিজারিয়ান অপারেশন করতে হচ্ছে। প্রসূতি মায়েরা ডায়াপার, খাবার ও পানি পাচ্ছেন না। আইভিএফ ক্লিনিক ধ্বংস এবং সাদা ফসফরাসের মতো বিষাক্ত অস্ত্রের ব্যবহার ফিলিস্তিনিদের প্রজনন ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘ব্যাপক অনাহার, বাস্তুচ্যুতি ও মহামারীর মধ্যেও সন্তান জন্মদান এবং তাদের বাঁচিয়ে রাখার এক অসম্ভব লড়াই একা কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছেন ফিলিস্তিনি মায়েরা।’
রানিয়া আবু আনজা নামে এক নারী ১০ বছর চিকিৎসার পর যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু ইসরাইলি বিমান হামলায় তার স্বামী ও দুই সন্তানই নিহত হয়। জোমানা আরাফা নামে আরেক মা যমজ সন্তান জন্ম দেন। এর ঠিক দু’দিন পর তথাকথিত নিরাপদ অঞ্চলেই তিনি এবং তার দুই শিশু ও মা নিহত হন। সন্তানদের জন্মনিবন্ধন আনতে বাইরে যাওয়ায় বেঁচে যান তার স্বামী।
ইসরাইল মূলত ফিলিস্তিনিদের বংশবৃদ্ধিকে ভয় পায়। এর আগে ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার বলেছিলেন যে, তার দুঃস্বপ্ন শুরু হয় যখন তিনি ভাবেন ‘আরেকটি ফিলিস্তিনি শিশু জন্ম নেবে’।
জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ বলেছেন, ‘এটি এমন এক ব্যবস্থার কলঙ্কজনক দলিল যা ফিলিস্তিনিদের জীবন, শরীর ও পরিবারকে দমনের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।’
সূত্র: মিডল ইস্ট আই