বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং বিগত স্বৈরাচারী শাসক গোষ্ঠীর মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তীর কিছু বিতর্কিত ও রাষ্ট্রদ্রোহীমূলক উগ্র মন্তব্য দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতাকে সরাসরি আঘাত করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার বেশ কয়েকটি ভিডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও আইনি বিতর্কের ঝড় উঠেছে। ভিডিওগুলি প্রকাশের পর একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতেও তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। তার বক্তব্যে উঠে আসে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল কিছু সুনির্দিষ্ট হুমকি।

গত শুক্রবার (১৯ জুন) গণমাধ্যমে দেওয়া চৈতালীর একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে দাঁড়িয়ে দেশের মানচিত্র খণ্ডিত করার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরও এই নারীর শেকড়ের জোর কোথায় যে প্রশাসন এখনও তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ নেয়নি? ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সাথে তার কোনো গোপন যোগসূত্র রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার জোর দাবি উঠেছে। পাশাপাশি তার ভারতীয় নাগরিকত্ব রয়েছে কিনা তাও তদন্তপূর্বক উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন নেটিজেনরা।

ভাইরাল ভিডিওতে মুসলিম-বিদ্বেষী ভারতীয় উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ভাষায় কথা বলা চৈতালী চক্রবর্তীকে অত্যন্ত দম্ভের সাথে বলতে শোনা যায়, ‘‘এই বাংলাদেশ আমার। আদি বাংলাদেশও আমার। আপনারা বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য চেয়ে আমরা সনাতনীদের জন্য আলাদা একটি প্রদেশ করব।’ তিনি এখানেই ক্ষান্ত হননি, বরং দেশের সার্বভৌমত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করার ভঙ্গিতে বলেন, ‘‘এক সময় কিন্তু এরকমই হবে, সনাতনীদের আলাদা একটি প্রদেশ হয়ে যাবে।’’

দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতিকে কটাক্ষ করে তিনি রাস্তায় নামাজ পড়া নিয়ে উস্কানিমূলক কথা বলেন এবং দাঙ্গা বাধানোর উস্কানি দিয়ে বলেন, ‘‘আপনাকেরা দুইটা মারবেন, আমরা একটা মারব। কিন্তু আমরাও মারব।’’ একই সাথে তাকে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ব্যর্থ দাবি করে অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষায় আক্রমণ করতে শোনা যায়। সে দাবি করে, এই (ইউনূস) সরকার পরিকল্পনা করেই নাকি বাংলাদেশে সনাতনী সম্প্রদায়কে ধ্বংস করতে এসেছিল।

চৈতালীর এই বিষোদগারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পরিচয় নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতুহল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চৈতালী চক্রবর্তী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের একজন নিয়মিত সদস্য, যিনি ২০১৬ সালের ২২ মে এই সংগঠনের সদস্যপদ লাভ করেন।

তিনি চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত ও বর্তমানে নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের একজন উগ্র সমর্থক। নিজেকে শেখ মুজিবুর রহমান ও গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার অন্ধ ভক্ত দাবি করে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন বলেছেন, তিনি ফিরবেন, তখন তিনি অবশ্যই ফিরবেন। কারণ, শেখ হাসিনা মানেই বাংলাদেশ।’’ এছাড়া অন্য ভিডিওতে তাকে ‘জুলাই বিপ্লব’কে কটাক্ষ করে বলতে শোনা যায়, ‘‘জুলাই জুলাই বললেই গণধোলাই হবে, সেই দিন চলে আসছে।’’ একই সাথে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারতের একক অবদান দাবি করে সরাসরি ভারতের পা চাটেন এবং নগ্ন দালালি প্রকাশ করে বলেন, ‘‘আমরা আজকে বাংলাদেশ পেয়েছি এটা ভারতের অবদান এটা স্বীকার করতেই হবে। তাই ভারতের সম্পর্কে আমরা সরাসরি ভারতকে সাপোর্ট করি কারণ ভারত থেকে আমরা সহযোগিতা পেয়েছি।’’

ভারতীয় ‘র’ ও সাউথ ব্লকের নীলনকশার অঘোষিত ট্রেইলার?

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চৈতালী চক্রবর্তীর এই বক্তব্য কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে নয়াদিল্লির কট্টরপন্থী থিংক ট্যাঙ্ক এবং গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর দীর্ঘদিনের গোপন মাস্টারপ্ল্যান।

ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো (সেভেন সিস্টার্স), যা শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ নামক একটি সরু পথ দিয়ে মূল ভারতের সাথে যুক্ত। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই চাচ্ছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল বা একটি বিস্তীর্ণ অংশকে বিচ্ছিন্ন করে জাতিসংঘের অধীনে বা আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে একটি ‘বাফার জোন’ বা আলাদা হিন্দু রাজ্য তৈরি করতে, যাতে তাদের সেভেন সিস্টার্স-এর নিরাপত্তা চিরতরে নিশ্চিত হয়। আর এই বাফার জোন তৈরির প্রধান অজুহাত হলো—"বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে"। চৈতালী চক্রবর্তীর মুখ দিয়ে মূলত দিল্লির সাউথ ব্লকের সেই গোপন এজেন্ডারই অঘোষিত ট্রেইলার প্রকাশ পেয়েছে।

বিশ্লেষকরা স্পষ্ট বলছেন, চৈতালীর মতো উগ্রপন্থীরা আসলে দেশের সাধারণ শান্তিপ্রিয়, দেশপ্রেমিক সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। এরা ধর্মকে রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ সনাতনীদের আবেগকে ব্ল্যাকমেইল করছে এবং ভিনদেশী সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার পাঁয়তারা করছে। এরা মূলত স্বাধীন বাংলাদেশে বসে ভিনদেশী প্রভুর এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী ‘ফিফথ কলামনিস্ট’ বা পঞ্চম বাহিনী। অনতিবিলম্বে চৈতালীর মতো বিশ্বাসঘাতক ভিনদেশী এজেন্টদেরকে গ্রেফতার করে দিল্লির মদদে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রদ্রোহী নেটওয়ার্ক গুড়িয়ে দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন তারা।

ভারতের আইন বনাম বাংলাদেশের নীরবতা

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো দেশে যদি কোনো সংখ্যালঘু নেতা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বিদেশের সাহায্য নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র বা প্রদেশ গঠনের হুমকি দিতেন, তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেশটির জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) বা অ্যান্টি-টেরোরিজম স্কোয়াড তাকে গ্রেফতার করে 'ইউএপিএ' বা 'ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট'-এর মতো কঠোর কালাকানুনে তিহার জেলের অন্ধকার সেলে নিক্ষেপ করত। দেশটির গণমাধ্যমে ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে দেওয়া হতো পাকিস্তান-কানেকশন নিয়ে একের পর এক খবর। এমনকি তার পৈতৃক বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হতো।

অথচ বাংলাদেশে দণ্ডবিধির ১২৩ (ক) এবং ১২৪ (ক) ধারায় স্পষ্ট বলা আছে—কোনো নাগরিক যদি স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ছিন্নভিন্ন করার কথা বলেন, আলাদা প্রদেশের দাবি তোলেন, কিংবা দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপকে আমন্ত্রণ জানান, তবে তা 'হাই ট্রিজন' বা চরম রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য হবে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড। অথচ এত বড় জঘন্য অপরাধ করার পরও চৈতালী প্রকাশ্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং রাষ্ট্রযন্ত্র ও সুশীল সমাজ একপ্রকার রহস্যজনক নীরব ভূমিকা পালন করছে।

লাখ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রের এক ইঞ্চি মাটিও কেটে আলাদা প্রদেশ বানানোর স্বপ্ন দেখা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সচেতন নাগরিকদের মতে, এই ধরনের 'টাইম বোমা' সদৃশ উগ্র বক্তব্যকে যদি এখনই কঠোর হস্তে দমন করা না হয়, তবে ভবিষ্যতে দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।

দেশজুড়ে এখন তীব্র ক্ষোভ আর একটাই প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি তার মেরুদণ্ড সোজা করে এই প্রকাশ্য রাষ্ট্রদ্রোহীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি পদক্ষেপ (মামলা ও গ্রেফতার) গ্রহণ করবে, নাকি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার জুজুর ভয়ে এই ভয়ঙ্কর অপরাধীকে ছাড় দিয়ে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়া হবে? দেশবাসী এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews