ব্রিটিশ টেলিভিশন চ্যানেল ফোর-এর অন্যতম জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ম্যারেড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে’ (এমএএফএস)-এর শুটিং চলাকালীন অন-স্ক্রিন স্বামীদের মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন দুই নারী। একই সঙ্গে অপর এক নারী তাঁর অন-স্ক্রিন সঙ্গীর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যৌন অসদাচরণের বর্ণনা দিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, চিত্রায়ণের সময় তাঁদের সুরক্ষায় নিয়োজিত প্রোডাকশন টিম পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিবিসি প্যানোরামার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসার পর সোমবার চ্যানেল ফোর তাদের সমস্ত স্ট্রিমিং ও লিনিয়ার প্ল্যাটফর্ম থেকে অনুষ্ঠানটির পর্বগুলো সরিয়ে নিয়েছে এবং এর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজগুলোও বন্ধ করে দিয়েছে।
‘ম্যারেড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে’ মূলত একটি সামাজিক পরীক্ষাধর্মী রিয়েলিটি শো, যেখানে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছেলে-মেয়েরা প্রথম দেখাতেই ছদ্ম-বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এরপর ক্যামেরা ও সাধারণ মানুষের নজরদারির মধ্যে তারা একসঙ্গে বসবাস শুরু করে। এই শো-এর মাধ্যমে পরিচিত হওয়া লিজ্জি (ছদ্মনাম) নামের এক নারী জানিয়েছেন, হানিমুনের সময় থেকেই তাঁর অন-স্ক্রিন স্বামী হিংস্র আচরণ শুরু করেন এবং বিষয়টি তিনি প্রোডাকশন সংস্থাকে জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি তাঁকে অ্যাসিড আক্রমণের হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। লিজ্জি জানিয়েছেন, ভয়ে তিনি শুরুতে বিষয়টি প্রকাশ করতে পারেননি এবং ঘটনার পর শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখানোর পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একে সম্মতিসূচক সম্পর্কের অংশ হিসেবে ধরে নেন। বর্তমানে লিজ্জি এই প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ক্লোই (ছদ্মনাম) নামের আরেক নারী। তিনি দাবি করেছেন, ঘুমের মধ্যে তাঁর সম্মতি ছাড়া অন-স্ক্রিন স্বামী তাঁর শরীরে হাত দেন এবং পরবর্তীতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি যখন আপত্তি জানান, তখন ওই ব্যক্তি উল্টো ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ক্লোই শো-এর নিয়োজিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে এই ঘটনার বিস্তারিত জানান এবং তাঁর ভাষ্যমতে বিশেষজ্ঞ নিজেই এটিকে ধর্ষণের শামিল বলে উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারের আগেই ক্লোই চ্যানেল ফোর এবং প্রযোজনা সংস্থাকে সব জানালেও পর্বগুলো প্রচার করা হয়, যা পরবর্তীতে তাঁকে মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত করে তোলে যে তিনি আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন।
অনুষ্ঠানে নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলেছেন ২০২৩ সালের সিজনের প্রতিযোগী এবং পেশায় পারফর্মিং আর্টসের শিক্ষক শোনা ম্যান্ডারসন। তিনি তাঁর অন-স্ক্রিন সঙ্গী ব্র্যাডলি স্কেলি’র বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ এনেছেন। শোনা জানান, একটি নির্দিষ্ট গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহারের পারস্পরিক চুক্তি থাকলেও ব্র্যাডলি তাঁর অনুমতি ছাড়াই তা লঙ্ঘন করেন, যা পরবর্তীতে তাঁকে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ এবং গর্ভপাতের মতো কঠিন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। ঘটনা জানার পর প্রযোজনা সংস্থা ও চ্যানেল ফোর অবশ্য এই জুটিকে শো থেকে বাদ দিয়েছিল। তবে ব্র্যাডলি স্কেলি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ ও যৌন অসদাচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চ্যানেল ফোর জানিয়েছে, গত মাসেই তারা শো-এর সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অন্যদিকে অনুষ্ঠানটির মূল প্রযোজনা সংস্থা সিপিএল প্রোডাকশনস দাবি করেছে, তাদের সুরক্ষামূলক প্রোটোকল অত্যন্ত উন্নত মানের ছিল এবং শুটিং চলাকালীন যখনই কোনো প্রতিযোগী নিরাপত্তার অভাব বোধ করেছেন, তখনই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে এই ঘটনা নিয়ে যুক্তরাজ্যের নারী সুরক্ষা সংস্থাগুলো তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নারী অধিকার আইনজীবী এবং ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রিজ ইন্ডিপেনডেন্ট স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটির চেয়ারপারসন ব্যারনেস হেলেনা কেনেডি কেসি বলেন, যেখানে স্পষ্ট সম্মতি থাকে না, সেখানে জোরপূর্বক যেকোনো শারীরিক সম্পর্কই যৌন অপরাধের শামিল। তিনি পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে চ্যানেল ফোরকে একটি স্বাধীন বহিরাগত তদন্ত দল নিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ