সুপ্রিমকোর্টের রিভিউ রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক বিধান পুনরুজ্জীবিত হলেও তা কার্যকরে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। কিছু বিষয় অস্পষ্ট থাকায় রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এ রায় আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরের নির্বাচন থেকে কার্যকর হতে পারে। এ বিষয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় কেউ কেউ। তবে সংবিধান সংশোধন জুলাই সনদের আলোকে, নাকি আদালতের রায়ের ভিত্তিতে কিংবা এর বাইরে সরকার ভিন্ন কোনো চিন্তা করছে-তা এখনো পরিষ্কার নয়।
সূত্র জানায়, সরকার আপাতত যেসব ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুটি নেই। যদিও সংসদে বিরোধী দল জামায়াত ইসলামী ও এনসিপি বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে জুলাই সনদের বাইরে অন্য কোনো কাঠামো তারা মানবে না।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি যেহেতু ফিরে এসেছে, এখন তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ত্রুটিগুলো দূর করে আরও আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। জাতীয় সংসদ বা সরকার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীন এখতিয়ার রাখে। এক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো কেমন হবে, প্রধান উপদেষ্টা কীভাবে নির্বাচিত হবেন-এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে রিট করেছিলাম। হাইকোর্টে আংশিক প্রতিকার পেয়েছি। বাকি প্রতিকার আমরা আপিল বিভাগে পাব বলে আশাবাদী। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রিভিউ রায়ের মাধ্যমে পূর্বের ব্যবস্থা ফিরে এসেছে। এখন এটা নির্ভর করবে পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিলের চূড়ান্ত রায়ের ভিত্তিতে। পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে লিভ টু আপিল শুনানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা আশা করছি শিগগিরই সে শুনানি হবে। বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। এর মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত হবে। মানুষের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে একমাত্র জাতীয় সংসদই যথাযথ আইন প্রণয়ন করতে পারে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আইন করা আদালতের কাজ নয়। আদালতের কাজ হলো আইন ঠিক আছে কিনা দেখা। আইন কোনটা হবে, কোনটা হবে না, এটা জাতীয় সংসদই ঠিক করে দিতে পারে।
বিএনপির সংসদ-সদস্য, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন যুগান্তরকে বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। জাতীয় সংসদে এর কাঠামো নিয়ে শক্তিশালী আইন হচ্ছে। তবে কোন কোন বিষয়ে সংশোধনী আসবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। শিগগিরই এ বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে সিদ্ধান্ত আসবে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর রিটকারী আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে লিভ টু আপিল শুনানির জন্য ছিল। অ্যাটর্নি জেনারেল আমাকে বলেছিলেন, সরকারের তরফ থেকে তাদের কোনো নির্দেশনা নেই। আপনারা যদি শুনানি করতে চান বা আদালত যদি শুনতে চান, তাহলে তাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আদালত যখন মামলা শুনানির জন্য আহ্বান করলেন, তখন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক দাঁড়িয়ে বললেন, এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে সংশোধনী আনা হচ্ছে। তিনি শুনানি না করার অনুরোধ করেন। শরীফ ভূঁইয়া আরও বলেন, আজ (সোমবার) আপিল শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে। আশা করছি শুনানি হবে।
জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল যুগান্তরকে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে লিভ টু আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সরকার কি ভাবছে এ নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
বিএনপির ৩১ দফায়ও রয়েছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি ‘নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে।
জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার : জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। তবে সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে রাখা আছে কয়েকটি বিকল্প। প্রথম ধাপে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের চেষ্টা করবে। সেই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে বিভিন্ন দলের প্রস্তাবিত নাম থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা বাছাই করা হবে। এরপরও সমাধান না হলে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের দুই বিচারপতিকে যুক্ত করে একটি কমিটির মাধ্যমে ভোটাভুটির প্রস্তাব রয়েছে। জুলাই সনদে আরও বলা হয়েছে, সব প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান অনুসরণ করা হবে। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার সুযোগ থাকবে না। পাশাপাশি বিচারপতিদের এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে ভোটাভুটির যে বিকল্প রাখা হয়েছে, তাতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছে বিএনপি। তারা চায়, সিদ্ধান্তের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকুক।
মামলার ইতিবৃত্ত : ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় দিয়েছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর ওই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি পৃথক আবেদন করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে গত বছরের ২১ নভেম্বর এ সংক্রান্ত বিধান পুনরুজ্জীবিত করে রায় দেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
ত্রয়োদশ সংশোধনীতে কাঠামো কি ছিল : ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য একটি ধাপভিত্তিক বিকল্প কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রথম বিকল্প ছিল, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি; দ্বিতীয়ত, তার আগের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি; তৃতীয়ত, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি; চতুর্থত, তার আগের আপিল বিভাগের বিচারপতি; পঞ্চমত, রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় যোগ্য নাগরিক এবং ষষ্ঠত, রাষ্ট্রপতি নিজেই।
পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষা : তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হলেও বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। যে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেটি নিয়ে চূড়ান্ত শুনানি এখনো শেষ হয়নি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে রিট হলে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। হাইকোর্টের রায়ের পর পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন সুজন সম্পাদক।