হেফাজতে ইসলামের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও অস্বস্তি কাটতে শুরু করেছে। জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সঙ্কট অনেকটাই এখন মিটে যাওয়ার পথে। বরং ভারতে মুসলিম নির্যাতন ইস্যুতে আবারো সম্মিলিতভাবে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে অরাজনৈতিক এ সংগঠনটি।

গত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে নানা বিভাজন দেখা দেয়। বিএনপি ও জামায়াত জোটে যাওয়াকে কেন্দ্র করে দলগুলো বিভক্ত হয়ে পড়ে। হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক প্লাটফর্ম হলেও এখানকার শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগই বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দলেরও শীর্ষ নেতা। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দু’টি গ্রুপই বিএনপির সাথে জোট করে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ দলের জুনায়েদ আল হাবীব, মনির হোসাইন কাসেমীসহ অনেক নেতা হেফাজতেরও শীর্ষ নেতা। একইভাবে খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলন জামায়াতে ইসলামীর জোটে থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দি¦তা করে। খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ এসব দলের বেশির ভাগ শীর্ষ নেতা হেফাজতেরও শীর্ষ পদে রয়েছেন। ফলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টানাপড়েন ও সঙ্কট দেখা দেয়। এতে অভ্যন্তরীণভাবে হেফাজত নেতাদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও কর্মী-সমর্থকরা বাগি¦তণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এ ছাড়া হেফাজতের এক নেতা আরেক নেতার বিরুদ্ধেও ফেসবুকে নানা ধরনের অভিযোগ তুলতে থাকেন। এতে হেফাজতে ভাঙনের সুর বেজে ওঠে। এমনকি হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরী সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মামুনুল হককে হেফাজতের কমিটি থেকে সরিয়ে দেয়া হতে পারে এবং হেফাজতের আরেকটি কমিটি গঠন হতে পারে এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের বাবুনগরে এক অনির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। হেফাজত আমিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নেতারা অভিমত দেন, নানা কারণে হেফাজতের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হেফাজতের কিছু নেতা বিভিন্ন দলে সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সংগঠনের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন শীর্ষ নেতারা। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক জোটে যাওয়া হেফাজত নেতাদের সাথে বৈঠক করতে কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর গত বৃহস্পতিবার ওই বৈঠকটি রাজধানীর খিলগাঁওয়ের জামিয়া ইসলামিয়া মাখজানুল উলূম মাদরাসায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে হেফাজত মহাসচিব, আল্লামা মামুনুল হকসহ শীর্ষ নেতারা যোগ দেন। বৈঠক থেকে মতভিন্নতা ভুলে আবারো ১৩ দফা দাবি আদায়ে হেফাজতের ঐক্য অটুট রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা যায়। এ ছাড়া ভারতে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন বন্ধে কর্মসূচি দেয়ারও সিদ্ধান্ত হয় হেফাজতের আরেকটি সভায়। হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেফাজতের সাবেক আমির মরহুম আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর ব্যক্তিগত সহকারী মাওলানা রাকিবুল ইসলাম ফারুকীর হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ এবং মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমানসহ হেফাজতের সিনিয়র নেতাদের জড়িয়ে চালানো অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা জানানো হয়। সভায় উপস্থিত নেতারা বলেন, উত্থাপিত অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে এর পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ বা বাস্তবভিত্তি পাওয়া যায়নি। তাই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়। ওই সভা থেকে অনলাইনে মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা অপবাদ প্রদান এবং মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালিয়ে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে মাওলানা রাকিবুল ইসলাম ফারুকীকে আমিরে হেফাজতের নির্দেশে হেফাজতে ইসলাম ভোলা জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক পদ ও সংগঠনের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত হয়। সভায় নেতারা অভিযোগ করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভিত্তিহীন বক্তব্য ও বিকৃত তথ্য প্রচারের মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মানহানি, সংগঠনের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ এবং সংগঠনের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এটি সত্য ও ন্যায়ের পরিপন্থী এবং মুসলিম সমাজে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। নেতৃবৃন্দ মনে করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শাপলা চত্বরের গণহত্যা সংক্রান্ত মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের পূর্বমুহূর্তে মামলার বাদি মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে বিচার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার জন্য দেশী-বিদেশী একটি চক্র ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। দেশবাসী ও সর্বস্তরের তাওহিদী জনতার প্রতি আহ্বান জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, কোনো গুজব, অপপ্রচার বা যাচাইবিহীন তথ্যে বিভ্রান্ত না হয়ে ধৈর্য, সচেতনতা ও ঐক্য বজায় রাখতে হবে। ইসলামবিদ্বেষী ও ষড়যন্ত্রকারী মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুযোগ যেন কেউ না পায়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করার এবং সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। ভবিষ্যতে সংগঠনের শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যক্রম, ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করা কিংবা হেফাজতের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মানহানিকর অপপ্রচার চালানো হলে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানানো হয়। কারো কোনো অভিযোগ থাকলে তা সংগঠনের মহাসচিবের কাছে লিখিতভাবে জমা দেয়ার আহ্বান জানানো হয়।

হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী নয়া দিগন্ত বলেন, হেফাজতের কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা জানাতে একটি নিয়ম রয়েছে। কেন্দ্রীয় আমির/মহাসচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তা না করে ফেসবুকে লেখালিখি সংগঠনের শৃঙ্খলাবিরোধী। এ কারণেই ফারুকীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সংগঠন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হেফাজত ভেঙে যাচ্ছে না বরং আরো শক্তিশালী ও সুসংহত হচ্ছে। যেসব বিষয়ে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছিল তা কেটে যাচ্ছে। সবার রাজনৈতিক প্লাটফর্ম থাকতে পারে কিন্তু ১৩ দফার ইস্যুতে একমঞ্চে থাকার বিষয়ে সবাই ঐকমত্য আছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews