ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনের অপরাধে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। তার পরিবারের সদস্য এবং নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও-এর বরাত দিয়ে সিএনএন এ তথ্য জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এ খবরে দুই দেশের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা কিছুটা হলেও কমে এসেছে। এদিকে পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের দূত জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে হামলা করবেন না-সেই সঙ্গে পালটা হামলা না চালানোরও অনুরোধ করেছেন। খবর সিএনএন, রয়টার্স, স্কাই নিউজ, আলজাজিরার।

প্রতিবেদনে জানা গেছে, দোকানব্যবসায়ী ২৬ বছরের এরফান সোলতানিকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার অভিযোগে ৮ জানুয়ারি কারাজের নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তারপর মাত্র তিন দিনের বিচারের ভিত্তিতে তাকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়। আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ায় সোলতানির পরিবারের কোনো স্বজন বা বন্ধুকে থাকতে দেওয়া হয়নি। বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল। তবে সেটা কার্যকর করা হয়নি। সোলতানির এক আত্মীয় সোমায়েহ সিএনএনকে বলেছেন, ‘খবর পেয়েছি যে সোলতানির দণ্ড কার্যকর হয়নি। তবে তার দণ্ড এখন পর্যন্ত বাতিলও হয়নি।’ পরে মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও এক প্রতিবেদনে জানায় যে সোলতানির মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হয়েছে।

এদিকে ইরানের গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, বিচার বিভাগ জানিয়েছে যে, বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। বিচার বিভাগ বলছে, কারাজের কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি সোলতানির বিরুদ্ধে ‘দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশ এবং শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড’ করার অভিযোগ আনা হবে। তবে তারা বলেছে যে, আদালত যদি এই অভিযোগগুলো নিশ্চিত করে তবে তার জন্য সাজা হিসাবে মৃত্যুদণ্ড প্রযোজ্য হবে না।

বুধবার সোলতানির পরিবারের এক সদস্য বুধবার স্কাই নিউজকে নিশ্চিত করেছেন, বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা থাকলেও সেটা কার্যকর করা হয়নি।

এদিকে বুধবার ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে এক মতবিনিময় সভায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি যে ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ হয়েছে এবং আটক বা গ্রেফতার কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনাও স্থগিত রেখেছে ইরান। আমরা নির্ভরযোগ্য কর্তৃপক্ষ থেকে এ তথ্যের নিশ্চয়তা পেয়েছি।’

ট্রম্প দাবি করেন, ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র তাকে জানিয়েছে, তেহরানের এখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে ইরানে হামলার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেননি ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নেয়, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে ওয়াশিংটন’। তার এ বক্তব্যের পরপরই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ ডলারের বেশি কমে গেছে।

ট্রাম্পের এ দাবির কয়েক ঘণ্টা পর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে বলেন, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। ‘ফাঁসি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না’, বলেন তিনি। আরাঘচি আরও দাবি করেন, তিন দিনের সহিংসতা ও তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’-এর পর পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে এবং দেশজুড়ে আপাতত শান্তি বিরাজ করছে। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্ষোভকারীদের হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। সরকারবিরোধীরা বলছে বিক্ষোভের কারণে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। নিহতদের মধ্যে ১০০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী রয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে নিহতের সংখ্যা ২৬১৫ জনে উন্নীত হয়েছে।

এদিকে পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের দূত রেজা আমিরি মোঘাদাম বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে জানিয়েছেন যে, হামলার কোনো ইচ্ছা তার নেই। সেই সঙ্গে তিনি তেহরানকে সংযত থাকারও আহ্বান জানিয়েছেন। বুধবার রাতে পাকিস্তানের সঙ্গে ডনকে তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চান না। সেই সঙ্গে তিনি (প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প) ওই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থে আঘাত না করার জন্য ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এর আগে, রয়টার্স জানিয়েছিল, ইরানে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যে কোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে-এমন শঙ্কায় বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের দেশ ছাড়তে নির্দেশনা দেয় দূতাবাসগুলো। এরও আগে, কাতারে মার্কিন ঘাঁটি থেকে কিছু সৈন্যও সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার শঙ্কায় ইরানের আকাশপথ পুরোপুরি প্রায় ৫ ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল খামেনি প্রশাসন।

আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না সৌদি আরব : ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না সৌদি আরব। সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের ওপর সম্ভাব্য সামরিক হামলার হুমকি দিচ্ছে, সেই প্রেক্ষাপটেই তেহরানকে এই বার্তা পাঠানো হয়েছে। সৌদি আরব স্পষ্ট করে বলেছে-তারা ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো সামরিক অভিযানের অংশ হবে না এবং তাদের ভূমি বা আকাশসীমা এমন কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে দেবে না।

যুক্তরাজ্যের দূতাবাস বন্ধ ঘোষণা : তীব্র বিক্ষোভ এবং সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘাতের জেরে ইরানে নিজেদের দূতাবাস সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে যুক্তরাজ্য। সেই সঙ্গে নাগরিকদের ইরানে ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্কতাও জারি করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বুধবার যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ইরানে যুক্তরাজ্যের দূতাবাসের সব কর্মকর্তা ও কর্মীকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে ফের স্বাভাবিকভাবে দূতাবাস চলবে। তার আগ পর্যন্ত দূর থেকে দূতাবাস পরিচালনা করা হবে।’

ইরানে ‘দ্রুত ও চূড়ান্ত আঘাত’ হানতে চান ট্রাম্প : প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তা দলকে জানিয়েছেন, ইরানে যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সেটি যেন খুব দ্রুত এবং চূড়ান্ত আঘাত হয়। তিনি সপ্তাহ বা মাসের পর মাস ধরে চলতে থাকা কোনো যুদ্ধ চান না। এনবিসি নিউজ এক মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনার সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তি এবং হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে। আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) যদি কিছু করেন, তাহলে সেটি হতে হবে চূড়ান্ত।’ এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত আকারের সামরিক অভিযান অনুমোদন করতে পারেন।

ট্রাম্পের রক্তাক্ত ছবি দেখিয়ে ইরানের হুমকি : তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে-এমন জল্পনার মধ্যে ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তার রক্তাক্ত মুখের পুরোনো ছবি দেখিয়ে হুমকি দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পেনসিলভানিয়ার জনসভায় বন্দুকধারীর গুলি থেকে অল্পের জন্য ট্রাম্প রক্ষা পেলেও কান ঘেঁষে বেরিয়ে যাওয়া সেই গুলিতে তিনি রক্তাক্ত হয়েছিলেন। সেই ছবি সম্প্রচার করেই ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল ক্যাপশনে পার্সি ভাষায় বার্তা দিয়েছে, ‘এবার আর বুলেট লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না!’ ইসরাইলের আই২৪ নিউজ এবং জেরুজালেম পোস্টের এক সংবাদিক পার্সি ভাষা থেকে অনুবাদ করে এক্সে সেই পোস্ট শেয়ার করেছেন। নিউজউইক জানিয়েছে, বুধবার তেহরানে এক শেষকৃত্য অনুষ্ঠান চলার সময় টিভি চ্যানেলে ট্রাম্পের ছবিটি দেখানো হয়। ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ লেখা ব্যানারের মধ্যে ওই ছবিটি ছিল। ইরানের টিভি চ্যানেলে এই ছবি দেখিয়ে বলা হয়েছে যে, আগেরবার ট্রাম্প অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেলেও এবার আর রক্ষা পাবেন না।

যদিও এই বার্তার বিষয়ে ওয়াশিংটন বা ইরান কোনো পক্ষই এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে এ ঘটনায় তাদের মধ্যে টানাপোড়েন আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews